গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণ ও সরবরাহ বিভ্রাট: রাজধানী জুড়ে তীব্র জনভোগান্তি ও চরম খাদ্য সংকট

রাজধানীর গুলশান এলাকায় তিতাস গ্যাসের একটি প্রধান পাইপলাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে বাড্ডা, গুলশান, বনানী ও বারিধারা সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। রোববার (৩ মে) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই গ্যাস সংকটের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলো, যাদের বিকল্প রান্নার ব্যবস্থা (যেমন এলপিজি সিলিন্ডার বা ইলেকট্রিক চুলা) নেই, তারা এক নজিরবিহীন বিপাকে পড়েছেন। বাণিজ্যিক হোটেলগুলোতে উপচেপড়া ভিড় এবং খাবারের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দুর্ঘটনার সূত্রপাত ও তিতাস কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ

রোববার সকালে গুলশান-১ চত্বর এলাকায় ইউটিলিটি সার্ভিসের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলাকালীন তিতাস গ্যাসের একটি উচ্চচাপ সম্পন্ন (High Pressure) মেইন পাইপলাইন ফেটে যায়। ঘটনার ভয়াবহতা এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ওই অঞ্চলের পুরো গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, লাইনে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় এবং মাটির গভীরে কাজ করতে হওয়ায় সংস্কার প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। রাত ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বাড্ডা ও সংলগ্ন এলাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক করার কোনো সম্ভাবনা দেখা যায়নি। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পাইপলাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ প্রতিস্থাপন না করা পর্যন্ত ঝুঁকি এড়াতে সরবরাহ বন্ধ রাখা হবে।

গৃহস্থালি পর্যায়ে রান্নার হাহাকার

সকাল থেকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা প্রস্তুত ছিলেন না। মধ্যবাড্ডার ময়নারবাগ এলাকার ভাড়াটিয়া সীমা আক্তার এই সংকটের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, সকালে কোনোমতে নাস্তা তৈরি করতে পারলেও দুপুরের রান্নার সময় চুলা জ্বলে ওঠেনি। স্বামী অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপদে।

সীমা আক্তারের মতো হাজারো পরিবারের দুপুরের মেনু ছিল দোকান থেকে কেনা পাউরুটি, কলা কিংবা বিস্কুট। দীর্ঘ সময় গরম ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শিশুদের মধ্যে শারীরিক ক্লান্তি ও কান্নাকাটির দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। গৃহিণীদের অভিযোগ, হঠাৎ করে গ্যাস চলে যাওয়ায় আগে থেকে চাল বা সবজি কেটে রাখলেও সেগুলো রান্নার অভাবে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁ ও হোটেলের চিত্র: এক অঘোষিত ‘খাদ্য যুদ্ধ’

বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ থাকায় সন্ধ্যার পর থেকে মানুষ দলে দলে নিকটস্থ হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোর দিকে ছুটতে শুরু করে। বাড্ডা হোসেন মার্কেট থেকে শুরু করে গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড পর্যন্ত এলাকার দৃশ্য ছিল থমথমে ও বিশৃঙ্খল। প্রতিটি খাবারের দোকানে দেখা গেছে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি এবং উপচেপড়া ভিড়।

  • দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া মজুদ: সাধারণ সময়ে এই হোটেলগুলো রাত ১১টা বা ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও, আজ চাহিদার তুলনায় খাবারের সরবরাহ ছিল অতি সামান্য। মধ্যবাড্ডার ‘মা বিরিয়ানি হাউজ’ এবং ‘নয়ন বিরিয়ানি হাউজ’-এর মতো জনপ্রিয় দোকানগুলোতে রাত ৮টার মধ্যেই বিরিয়ানি ও ভাতের মজুত শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতাকে দেখা গেছে ক্ষুধার্ত অবস্থায় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের জন্য আকুতি জানাতে।

  • বিক্রেতাদের অসহায়ত্ব: নান্না বিরিয়ানির পরিবেশক আব্দুস সামাদ জানান, তারা প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার রান্না করেন, আজ তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকান অতিরিক্ত ডেকচি রান্না করেও ক্রেতাদের চাপ সামাল দিতে পারেনি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ক্রেতারা নিজেরাই প্যাকেট থেকে খাবার সংগ্রহ করতে শুরু করেন।

  • ছোট হোটেলগুলোর কার্যক্রম বন্ধ: লিংক রোডের বিপরীত পাশের ছোট ভাতের হোটেলগুলো রাত ৯টার আগেই তাদের ঝাঁপ ফেলে দিতে বাধ্য হয়। চাল ও তরকারি শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন করে রান্নার সুযোগ না থাকায় তারা দোকান বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়।

মাঠ পর্যায়ের সংকট ও সাধারণের প্রতিক্রিয়া

সরেজমিনে বাড্ডা ও গুলশান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভাতের হোটেলগুলোতে ভিড় এতই বেশি ছিল যে অনেক জায়গায় ছোটখাটো ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটেছে। খাবার না পেয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে ছুটেছেন সাধারণ মানুষ। মোহাম্মদ আজম নামের এক ভুক্তভোগী তার স্ত্রীকে নিয়ে খাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন, কিন্তু রেস্তোরাঁর চারপাশের জটলা দেখে ভেতরে ঢোকার সাহস পাননি।

আদর্শনগর গলির মুখে ক্রেতাদের ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। সেখানে ক্রেতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন যে কখন নতুন করে রান্না করা খাবার আসবে। অনেককে দেখা গেছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর নিরাশ হয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে।

দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ

এই হঠাৎ সৃষ্ট গ্যাস সংকট নগরীর অবকাঠামোগত নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাতের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সোমবার সকালের নাস্তা এবং স্কুলগামী শিশুদের টিফিন তৈরি নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিন হোটেল থেকে খাবার কেনা আর্থিক ও স্বাস্থ্যের দিক থেকে দুঃসাধ্য, যা তাদের ভোগান্তিকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কারিগরি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে লাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি জনবহুল এলাকায় হওয়ায় এবং মাটির নিচে অন্যান্য ইউটিলিটি সংযোগ থাকায় সাবধানে কাজ করতে হচ্ছে। সরবরাহ পুনরায় চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার এবং সিলিন্ডার গ্যাস বা অন্য কোনো বিকল্প ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যদিও নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে এমন বিকল্প ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।