ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে কিছু গোল কেবল জালে বল জড়ানোর পরিসংখ্যান নয়, বরং সেগুলো হয়ে ওঠে একেকটি অমর শিল্পকর্ম। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে লিওনেল মেসির করা সেই শেষ মুহূর্তের গোলটি ফুটবল ইতিহাসের তেমনই এক মহাকাব্যিক অধ্যায়। আজ দীর্ঘ এক যুগ (১২ বছর) অতিক্রম করলেও বেলো হরাইজন্তের সেই জাদুকরী মুহূর্তের রেশ এখনো বিশ্বের কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে অমলিন ও জীবন্ত হয়ে আছে।
Table of Contents
মিনেইরো স্টেডিয়ামের স্নায়ুক্ষয়ী সেই লড়াই
২০১৪ সালের ২১ জুন, বেলো হরাইজন্তের ঐতিহাসিক মিনেইরো স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘এফ’-এর দ্বিতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইরান। প্রাক-ম্যাচ বিশ্লেষণে আর্জেন্টিনা পরিষ্কার ফেভারিট থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ে ইরান এক অভেদ্য দেওয়াল তৈরি করেছিল। তৎকালীন কোচ কার্লোস কুইরোজের প্রশিক্ষিত ‘টিম মেল্লি’ পুরো ম্যাচজুড়ে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জমাট রক্ষণভাগ দিয়ে আলবিসেলেস্তে আক্রমণভাগকে পুরোপুরি দিশেহারা করে রেখেছিল। ম্যাচের নির্ধারিত সময় গড়িয়ে যখন যোগ করা সময়ে (ইনজুরি টাইম) প্রবেশ করছিল, তখন স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক এবং বিশ্বজুড়ে থাকা ফুটবল ভক্তদের মনে বড় কোনো অঘটনের শঙ্কা প্রকট হয়ে উঁকি দিচ্ছিল।
ইরানের কঠোর রক্ষণাত্মক কৌশলের সামনে সার্জিও আগুয়েরো, গঞ্জালো হিগুয়েন এবং অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ারা বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন। খেলাটি গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল এবং মনে হচ্ছিল ইরান বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক উপহার দিতে যাচ্ছে। কিন্তু ফুটবলের বিধাতা সেদিন অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসি।
৯০+১ মিনিটের সেই অবিশ্বাস্য গোল
ম্যাচ তখন ৯০ মিনিট পেরিয়ে ইনজুরি টাইমের প্রথম মিনিটে (৯০+১) পদার্পণ করেছে। ডি-বক্সের বাইরে ডান প্রান্তে বল পান মেসি। সামনে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কঠোর প্রাচীর এবং ইরানি ফরোয়ার্ড রেজা গুচানেজাদ তখন মেসির পথ আগলে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মেসি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে সামান্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে ডান দিক থেকে ভেতরের দিকে বলটি নিয়ে আসেন। এরপরই দেখা যায় সেই চিরচেনা জাদুর বহিঃপ্রকাশ।
বক্সের বেশ বাইরে থেকেই বাঁ পায়ের এক নিখুঁত ও বাঁকানো শটে বলটি পাঠিয়ে দেন গোলপোস্টের বাম কোণ বরাবর। ইরানি গোলরক্ষক আলিরেজা হাঘিঘি তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে ডাইভ দিলেও বলের নাগাল পাননি। বলটি জালের একেবারে ভেতরের কোণ দিয়ে পোস্টে প্রবেশ করে। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় ইরানের স্বপ্ন, আর গগনবিদারী উল্লাসে ফেটে পড়ে মিনেইরো স্টেডিয়াম। এই একটি গোল কেবল ম্যাচ জেতায়নি, বরং গ্রুপ পর্বের এক ম্যাচ হাতে থাকতেই আর্জেন্টিনাকে নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে দিয়েছিল।
কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়ার আবেগঘন মূল্যায়ন
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রধান কোচ প্রয়াত আলেহান্দ্রো সাবেয়া ইরানের লড়াকু মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, ইরান কৌশলগতভাবে আর্জেন্টিনাকে চরম বিপাকে ফেলেছিল। সাবেয়া বলেন, “ইরান অসাধারণ খেলেছে এবং তারা যে একটি দুর্দান্ত সুসংগঠিত দল, সেটা আজ মাঠেই প্রমাণ করেছে। তারা আমাদের জন্য জীবন কঠিন করে তুলেছিল।”
তবে পার্থক্যের কারিগর প্রসঙ্গে সাবেয়া মেসির বিশেষত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, “ইরানের সবকিছুই ছিল, কেবল একটি জিনিস ছিল না—আর তা হলো লিওনেল মেসি। মেসি একজন জিনিয়াস, আর সৌভাগ্যবশত সে একজন আর্জেন্টাইন। ওই বিশেষ শটটি ফেরানোর জন্য দুইজন গোলরক্ষক একসাথে দাঁড়িয়ে থাকলেও হয়তো সফল হতো না। মেসি থাকলে সবই সম্ভব।”
পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সেই ম্যাচে ইরান মেসিকে আটকাতে ‘ম্যান-মার্কিং’ বা দ্বৈত পাহারার ব্যবস্থা করেছিল। পুরো ম্যাচে মেসির জন্য জায়গা বের করা ছিল প্রায় দুঃসাধ্য। তবুও একজন মহান ফুটবলার হিসেবে সামান্য সুযোগকেই তিনি কীভাবে সাফল্যে রূপান্তর করতে পারেন, তা ওই গোলের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়। এটি ছিল সেই বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে মেসির জয়সূচক গোল। এর আগে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষেও তিনি অনবদ্য এক গোল করেছিলেন।
ম্যাচের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টস:
তারিখ: ২১ জুন, ২০১৪
ভেন্যু: মিনেইরো স্টেডিয়াম, বেলো হরাইজন্তে, ব্রাজিল।
ফলাফল: আর্জেন্টিনা ১ – ০ ইরান।
বল পজেশন: আর্জেন্টিনা ৭০%, ইরান ৩০%।
টার্গেট শট: আর্জেন্টিনা ৪টি, ইরান ৩টি।
ফুটবল ইতিহাসে এই গোলের তাৎপর্য
যুগ পেরিয়ে গেলেও মিনেইরোর সেই রাত আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গোলটি মেসিকে সেই বিশ্বকাপে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফাইনাল খেলেছিল। যদিও ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে শিরোপা স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল, তবে ইরানের বিপক্ষে সেই মুহূর্তটি লিওনেল মেসির অতিমানবীয় দক্ষতার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি ছিল এমন এক দৃশ্য যখন পুরো বিশ্ব আবারও প্রত্যক্ষ করেছিল কেন মেসিকে ‘ভিন্ন গ্রহের ফুটবলার’ বলা হয়। ইরানের জমাট রক্ষণ ভেঙে করা সেই বাঁকানো শটটি আজও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের উজ্জ্বল উদাহরণ।
