জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নামে ফারুকীর এলাহী কান্ড

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির সঙ্গে সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পৃক্ত সময়কালকে কেন্দ্র করে এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ এবং আপ্যায়ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৮ জানুয়ারি এক সপ্তাহ সময় দিয়ে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ব্যবস্থাপক, উপপরিচালক, কিউরেটর, উপকিউরেটরসহ অন্তত ৯৬টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ২৬ জানুয়ারি থেকে মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়।

২৬ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তন এবং সিনেমা কমপ্লেক্সে এই মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলে বলে জানা যায়। ওই সময় প্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাই করে ভেতরে প্রবেশ করানো হতো এবং ধারাবাহিকভাবে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।

জাতীয় জাদুঘরের কর্মচারী নাজু মণ্ডল জানান, নির্ধারিত সময়ের পর প্রতিদিন বহু প্রার্থী সেখানে আসতেন এবং তাদের কাগজপত্র যাচাই করে ভেতরে প্রবেশ করানো হতো। একই সময় প্রার্থী মো. ফারুক জানান, তিনি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন, যদিও তখন আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষার পর পুনরায় আবেদন করতে বলা হয় এবং পরে বিষয়টি স্থগিত হয়ে যায়।

অপর এক প্রার্থী অভিযোগ করেন, নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য তার কাছে বিপুল অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি জানান, জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী মো. সুমন মিয়া তাকে অর্থের বিষয়ে অবহিত করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শুরুতে তিন থেকে চারশ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে একশর কিছু বেশি করা হয়। এই সময়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাধিক পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে তানজিম ইবনে ওয়াহাবকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং পরে তিনি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের অতিরিক্ত দায়িত্বও পান।

অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র অনুযায়ী, ছয় মাসে শুধুমাত্র নাশতা ও আপ্যায়ন খাতে এক কোটি দুই লক্ষ টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া স্বল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সভা, অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় করা হয়।

নিচে উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—

খাতের নামব্যয়ের পরিমাণ
নাশতা ও আপ্যায়ন (ছয় মাস)১ কোটি ২ লক্ষ টাকা
বিশেষ আপ্যায়ন ও অন্যান্য ব্যয় (২৫ দিন)২৯ লক্ষ ৫৪ হাজার ৭৬০ টাকা
স্বেচ্ছাসেবক ব্যয়৫৭ লক্ষ টাকা
বিদেশি প্রতিনিধি ড. সেলিম এম আল মালিকের আপ্যায়ন৭০ হাজার টাকা
সভা ও অনুষ্ঠান ব্যয়১০ লক্ষ ২৮ হাজার ৫১৫ টাকা
আলোকসজ্জা ও সংস্কার কাজ৩৮ লক্ষ টাকার বেশি
গ্যালারি সংস্কারপ্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা
সীমানা প্রাচীর নির্মাণ৬৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৭০ টাকা

এছাড়া মোহাম্মদপুর এলাকার আড্ডা প্রবর্তনা রেস্তোরাঁর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নাশতা ও সভার ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রেস্তোরাঁটির দায়িত্বে থাকা মং মারমা ও মো. শাহিন জানান, তারা সীমিত পরিসরে প্রতিদিন কয়েকজনের জন্য সাধারণ খাবার সরবরাহ করতেন এবং বড় অঙ্কের বিলের বিষয়টি তাদের জানা নেই।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব দাবি করেন, কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং স্বেচ্ছাসেবক সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রমই পরিচালিত হয়েছে। জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম জানান, নিয়োগ কার্যক্রম একটি নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়।

সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।