তনু হত্যায় নতুন আশার আলো

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ এক দশক পর তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। সেনাবাহিনীর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সদস্যের গ্রেপ্তার এবং ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে বিচার পাওয়ার আশা জেগেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ‘অন্ধকারে’ থাকা এই আলোচিত মামলাটি এখন আবারও জনমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার ভেতরে টিউশন শেষে নিখোঁজ হন তনু। পরে পাওয়ার হাউস এলাকার ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। শুরু থেকেই ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উঠলেও প্রাথমিক দুই দফা ময়নাতদন্তে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি।

পরবর্তীতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ জানায়, তনুর পোশাক থেকে সংগৃহীত আলামতে একাধিক পুরুষের জৈবিক নমুনা পাওয়া গেছে, যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনে। তবে দীর্ঘ সময়েও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবার ও জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি (সংক্ষিপ্ত সময়রেখা)

সময়ঘটনা
২০১৬ মার্চতনু নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধার
২০১৬ মার্চহত্যা মামলা দায়ের
২০১৬ এপ্রিল–জুনময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ অস্পষ্ট
২০১৭ মেআলামতে একাধিক পুরুষের জৈবিক নমুনা শনাক্ত
২০১৭ অক্টোবরসন্দেহভাজনদের সেনা এলাকায় জিজ্ঞাসাবাদ
২০২৬ এপ্রিলসাবেক সেনা সদস্য গ্রেপ্তার ও ডিএনএ পরীক্ষা

সম্প্রতি ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে সাবেক এক সেনা সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। পরে তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হলে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তদন্তকারীরা জানান, তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মামলার অন্যান্য সন্দেহভাজনদেরও শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে।

তনুর পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে, মামলাটি প্রভাবশালী মহলের কারণে বারবার থমকে গেছে। নিহত তনুর মা-বাবা এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে সেনানিবাসে কর্মরত একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা ছিল এবং শুরু থেকেই তারা এসব নাম উল্লেখ করে আসছেন।

তনুর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও পুরো সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত তারা সন্তুষ্ট নন। অন্যদিকে তনুর বাবা বলেন, তারা চান জীবদ্দশায় যেন মেয়ের হত্যার বিচার দেখতে পারেন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হয়।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। তারা আশা করছেন, ডিএনএ পরীক্ষার ফল এবং নতুন জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হবে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজও মনে করছে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর মামলাটিতে যে অগ্রগতি এসেছে তা ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে তারা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সব সন্দেহভাজনকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।