জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে সংস্কৃতি চর্চায় প্রত্যয়ী বার্তা

জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের চুয়াল্লিশতম বার্ষিক অধিবেশন ও রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ের বক্তব্য উপস্থাপিত হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, আবার রবীন্দ্রচর্চা ও নজরুলচর্চা বিকশিত হবে এবং সংস্কৃতির অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সমাজ নতুনভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাঁর মতে, সংস্কৃতি চর্চা মানুষকে হিংসা, লোভ ও অশুভ প্রবণতা থেকে দূরে রাখে। তিনি আরও বলেন, সুদিন কিংবা দুর্দিন কোনো অবস্থাতেই স্থায়ী নয়; সাহস, সততা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের মূল পথ।

সমাপনী দিনের কর্মসূচি শুরু হয় গুণীজন সম্মাননা প্রদান দিয়ে। এ পর্বে অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেনকে রবীন্দ্রপদক প্রদান করা হয়। সম্মাননা গ্রহণ করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, এটি তাঁর জীবনের একটি অত্যন্ত সম্মানজনক অর্জন। তিনি ঋণ স্বীকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে গুরুজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

এরপর কিশোর ও সাধারণ বিভাগে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণদের মধ্যে সনদ ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অংশ নেওয়া মোট ছাপ্পান্ন জন প্রতিযোগীকে এই পর্যায়ে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শোক প্রস্তাব উপস্থাপন। এতে প্রয়াত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর সংঘটিত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়। পরে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সম্মেলনের ঘোষণাপত্র পাঠের পর নতুন কার্যনির্বাহী কাঠামো ঘোষণা করা হয়। সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মফিদুল হক সভাপতি, বুলবুল ইসলাম নির্বাহী সভাপতি, লিলি ইসলাম সাধারণ সম্পাদক এবং জহিরুল হক খান কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মোট একষট্টি সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কাঠামো গঠন করা হয়।

নিচে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান পদসমূহ উপস্থাপন করা হলো—

পদনাম
সভাপতিমফিদুল হক
নির্বাহী সভাপতিবুলবুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদকলিলি ইসলাম
কোষাধ্যক্ষজহিরুল হক খান

সকালবেলার কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন জেলা ও শাখা থেকে আগত প্রতিনিধিরা সাংগঠনিক বিষয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।

একই দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগীতচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বিষয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও সংগীত ব্যক্তিত্ব। তাঁরা শিক্ষার সঙ্গে সংগীতচর্চার সম্পর্ক এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা বিস্তারের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

দিনের শেষ পর্বে সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি সূচিত হয়। এতে অংশ নেন দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। এরপর সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশিত হয়। সর্বশেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দুই দিনের এই অধিবেশন ও সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সংগঠনটির ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী জাহিদুর রহিমের প্রয়াণ দিবসকে স্মরণ করে তাঁর নামে একটি স্মৃতি পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে সারাদেশে সাংগঠনিক পরিসর বিস্তৃত করার লক্ষ্যে এর নাম পরিবর্তন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ রাখা হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিরাশি শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নবীন প্রজন্মকে সংগীতচর্চায় উৎসাহিত করতে প্রতিযোগিতাভিত্তিক জাহিদুর রহিম স্মৃতি পদক চালু রাখা হয়েছে, যা ধারাবাহিকভাবে সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রেখে চলেছে।