পুলিশের ইউনিফর্মে ৭৬ কোটি খরচের পর আবার পোশাক বদলের দাবি

বাংলাদেশ পুলিশের নির্ধারিত পোশাক পরিবর্তন নিয়ে আবারও নতুন বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মতামত, সরকারের নীতিগত সতর্কতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিষয়—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি বাহিনীর পাঁচজন সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পাঁচ ধরনের পোশাকের নমুনা উপস্থাপন করেন। এসব নমুনার মধ্যে ছিল খাকি শার্টের সঙ্গে গাঢ় নীল প্যান্ট, সম্পূর্ণ খাকি রঙের পোশাক, পূর্বে ব্যবহৃত গাঢ় নীল রঙের পোশাক, অনুমোদিত লোহা বর্ণের পোশাক এবং আকাশি রঙের শার্টের সঙ্গে গাঢ় নীল প্যান্ট। এই পাঁচটি রঙ থেকে একটি চূড়ান্ত করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অবস্থানে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বারবার পোশাক পরিবর্তন করলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয় এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে। তাই সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ব্যয় ও পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন নতুন রঙ হিসেবে লোহা বর্ণের পোশাক নির্ধারণ করা হয়। এই পোশাক তৈরির জন্য দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাদের মোট কাজের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ছিয়াত্তর কোটি টাকা।

নিচের সারণিতে বিষয়টি তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকালঅন্তর্বর্তী সরকারকালীন সময়
নির্ধারিত পোশাকের রঙলোহা বর্ণ
মোট অর্থমূল্যছিয়াত্তর কোটি টাকা
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানদুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
পুলিশের আনুমানিক সদস্য সংখ্যাপ্রায় দুই লাখ
বার্ষিক পোশাক বরাদ্দপাঁচ সেট

এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের শেষ দিকে মহানগর পর্যায়ের অনেক ইউনিট নতুন পোশাক ব্যবহার শুরু করে। তবে জেলা পর্যায়ের অনেক পুলিশ সদস্য তখনো পুরোনো পোশাকেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে বাহিনীর মধ্যে একধরনের ভিন্নতা তৈরি হয়।

পোশাক পরিবর্তনের পটভূমি

পুলিশের পোশাক সর্বশেষ বড় পরিবর্তন হয়েছিল দুই দশকেরও আগে। দীর্ঘ সময় পর নতুন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পর থেকেই বাহিনীর ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেক সদস্য মনে করেন, নতুন পোশাকের রঙ বাস্তব পরিবেশে উপযোগী নয় এবং এতে তাদের পেশাগত পরিচয় প্রকাশে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা ও ব্যঙ্গ-পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অনেক সদস্য মানসিক অস্বস্তিও প্রকাশ করেছেন। পুলিশের একটি সংগঠনও বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, মাঠপর্যায়ের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি এবং একই ধরনের পোশাক অন্য বাহিনীর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় শনাক্তকরণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সরকারি অবস্থান ও আলোচনা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পোশাক পরিবর্তন নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকারের লক্ষ্য এমন একটি পোশাক নির্ধারণ করা, যা পরিবেশ, ঐতিহ্য এবং ব্যবহারিক দিক থেকে উপযুক্ত হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে যাতে বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবার পরিবর্তন করলে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর চাপ পড়বে। তারা মত দিয়েছেন, পোশাক পরিবর্তনের চেয়ে বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি, সেবা মান উন্নয়ন এবং পেশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

সরবরাহ পরিস্থিতি

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানা যায়, নির্ধারিত কাপড়ের একটি অংশ ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে নতুন রঙের বিষয়ে আলোচনা চলায় সাময়িকভাবে কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের পর সে অনুযায়ী কাজ এগোবে বলে জানানো হয়েছে।

উপসংহার

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন এখন কেবল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যয়, নীতি এবং জনমতের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল, গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত হবে।