মানবসেবার চিকিৎসক ডা. কামরুল ইসলাম চাঁদাবাজি শিকার

প্রখ্যাত ইউরোলজি ও কিডনি প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নিঃস্বার্থ মানবসেবার জন্য পরিচিত, এবার চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগকে কেন্দ্র করে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। রাজধানীর শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালকে ঘিরে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে চিকিৎসা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

অধ্যাপক কামরুল ইসলাম চিকিৎসা জগতে একজন সুপরিচিত নাম। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে দুই হাজারেরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন করে ব্যতিক্রমী মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তাঁর অস্ত্রোপচারের সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। মানবসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন। এমন একজন চিকিৎসকের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শেরে বাংলা নগর থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন মঈনের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি, কর্মক্ষেত্রে হুমকি এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ডা. কামরুল ইসলাম দাবি করেন, বিষয়টি প্রথমে সীমিত আকারে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাপ ও হুমকির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

তিনি জানান, গত বছরের জুলাই–আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। কখনো সরাসরি অর্থ দাবি, কখনো আবার প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং একাধিকবার রাজনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন, তবে কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে একটি সিসিটিভি ফুটেজ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে জানা যায়। ওই ফুটেজে হাসপাতালের ভেতরে একজন ব্যক্তিকে কর্মীদের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতে এবং নিজেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি হুমকিমূলক আচরণ করেন এবং হাসপাতালের পরিবেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। অভিযুক্ত হিসেবে মো. মঈন উদ্দিন মঈনের নাম উঠে এসেছে, পাশাপাশি মাঈনুদ্দিন নামের আরেকজনের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ রয়েছে, যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মূল বিরোধের সূত্রপাত হয় খাদ্য সরবরাহ (ক্যাটারিং) টেন্ডারকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টেন্ডার না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং এরপর থেকেই চাপ, হুমকি ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। বিষয়টি একাধিকবার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অভিযুক্ত পক্ষের অবস্থান এবং পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে—

অভিযোগ ও অবস্থানের তুলনামূলক চিত্র

বিষয়অভিযোগকারীর বক্তব্যঅভিযুক্ত পক্ষের অবস্থানপুলিশের প্রাথমিক মন্তব্য
চাঁদাবাজিনিয়মিত অর্থ দাবি ও চাপ সৃষ্টিঅভিযোগ অস্বীকার বা ভিন্ন ব্যাখ্যাতদন্তাধীন
ভয়ভীতি প্রদর্শনহাসপাতালের ভেতরে হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টিঅভিযোগ অস্বীকৃতযাচাই চলছে
টেন্ডার ইস্যুটেন্ডার না দেওয়ায় বিরোধ শুরুনির্দিষ্ট বক্তব্য নেইপ্রাথমিক তদন্ত চলছে
রাজনৈতিক প্রভাবরাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাপঅস্বীকৃতিসমঝোতার চেষ্টা চলছে

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিয়ে থানায় একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ চাঁদাবাজির মামলা রেকর্ড হয়নি। বিষয়টি মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও পারস্পরিক অভিযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং তা যাচাই করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ডা. কামরুল ইসলাম দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, এটি কোনো সাধারণ বিরোধ নয় বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি সংগঠিত চাপ প্রয়োগ ও চাঁদাবাজি চক্রের কার্যক্রম। তিনি হাসপাতালের নিরাপত্তা, চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখা এবং কর্মীদের সুরক্ষার জন্য দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এই ঘটনা রাজধানীর স্বাস্থ্যখাতে নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে মতামত পাওয়া যাচ্ছে।