হরমুজে নীরব ঘাতক: ইরানের মাইন কৌশলের ইতিহাস

পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির নিচে ইতিহাস আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ১৯৮৭ সালের একটি ছোট নৌকা, যা ফারসি দ্বীপের কাছে নিঃশব্দে ভেসে গিয়েছিল, তখনই জানিয়ে দিয়েছিল যে সমুদ্রযুদ্ধের আধুনিকতা সবসময় প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। সেই সময় ইরান ৪ লক্ষ ১৪ হাজার টনের মার্কিন তেল ট্যাঙ্কার এসএস ব্রিজেটন-কে ক্ষতবিক্ষত করে দেখিয়েছিল, যে কোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই সামুদ্রিক মাইন একটি বিশাল শক্তিকে কীভাবে অচল করা যায়।

ঘটনাবছরবিবরণ
ব্রিজেটন বিস্ফোরণ1987ইরান নীরব ঘাতক মাইন দিয়ে মার্কিন তেল ট্যাঙ্কার ক্ষতবিক্ষত করল
অপারেশন আর্নেস্ট উইল1987কুয়েতি ট্যাঙ্কার সুরক্ষার জন্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন
ব্রিজেটনের পরে1987মাইন শনাক্তকরণ ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন জাহাজগুলোই বিপদে পড়ল

ব্রিজেটন বিস্ফোরণ তখন বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল, মাত্র ১৫ ডলারের প্রযুক্তি দিয়ে হাজার কোটি ডলারের সামরিক সম্পদকে অসহায় করা সম্ভব। সেই একই কৌশল আজ ২০২৬ সালেও হরমুজ প্রণালীকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। ইরান ইসরায়েলের সাথে সংঘাতের প্রেক্ষিতে সমুদ্রপথে মাহম-৩ থেকে মাহম-৭ সিরিজের আধুনিক মাইন স্থাপন করেছে।

মাহম মাইন শুধুমাত্র চৌম্বক ক্ষেত্র নয়, ইঞ্জিনের সামান্য কম্পন ও পানির চাপের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও শনাক্ত করতে সক্ষম। সোনার আবরণ মাইনের সিগন্যালকে আড়াল করে, ফলে আধুনিক স্ক্যানারেও এটি সাধারণ পাথরের সাথে সহজে আলাদা করা যায় না।

মাইন সিরিজপ্রযুক্তিসক্রিয়তাবৈশিষ্ট্য
মাহম-৩দেশীয় ইরানিমাসখানেকচৌম্বক ও কম্পন সেন্সর, সোনার আবরণ
মাহম-৫দেশীয় ইরানি৩ মাসউচ্চ সংবেদনশীলতা, পানি চাপ শনাক্তকরণ
মাহম-৭উন্নত দেশীয়৬+ মাসজাহাজের উপস্থিতি অনুসন্ধান ও নীরব আক্রমণ

২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরনো মাইন সুইপার জাহাজ অবসর দেয়ার পর হরমুজে তাদের সামরিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। বর্তমান লিটেরাল কমব্যাট শিপগুলো ড্রোন ও হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভরশীল, যা মাহম মাইনের বিপক্ষে কতটা কার্যকর হবে তা অনিশ্চিত।

ব্রিটেনের রয়্যাল নেভি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে পরিচিত ‘ডিগসিং’ প্রযুক্তি আধুনিকায়ন করে নতুন প্রোটোটাইপ মাইন হান্টার মোতায়েন করছে। রোবটিক সাবমেরিন, হেলিকপ্টার-নিক্ষিপ্ত নীল-সবুজ লেজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মাহম শনাক্ত করা হবে।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক পথের অস্থিতিশীলতা প্রমাণ করছে, ইরানের নীরব মাইন কৌশল এখনও সুপারপাওয়ার দেশগুলোর জন্য ভয়ঙ্কর। সময়ের সঙ্গে অস্ত্রের রূপ পরিবর্তিত হলেও সমুদ্রের তলায় লুকানো এই নিঃশব্দ ঘাতকরাই আধুনিক ভূ-রাজনীতির এক শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবে অবস্থান করছে।

মোট কথা, ৩৮ বছর আগে যেমন ইরান সামুদ্রিক ঘাতকতায় মার্কিন শক্তিকে থমকে দিয়েছিল, ২০২৬-এও তার কৌশল ইতিহাসকে পুনরাবৃত্তি করছে, যা প্রমাণ করে আধুনিক প্রযুক্তি সবসময় পর্যাপ্ত নয়, সাহস এবং কৌশলও সমুদ্রযুদ্ধে সমান গুরুত্বপূর্ণ।