চট্টগ্রামে বস্তাভর্তি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ লুটের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই মামলার রায় প্রদান করা হলো।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর আইনজীবী রেজাউল করিম সাংবাদিকদের জানান (প্রথম আলো), পূবালী ব্যাংক চট্টগ্রামের সিডিএ করপোরেট শাখার সাবেক গাড়িচালক বিজয় কুমার দাশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
একই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যাংকের সাবেক জুনিয়র অফিসার (ক্যাশ) রাজিবুর রহমান, নিরাপত্তারক্ষী মো. আশিকুর রহমান, তানজুর রহমান এবং মাজহারুল ইসলামকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের প্রত্যেককে আরও ১০ বছর অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। রায় ঘোষণার সময় সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং রায়ের পরপরই তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার পটভূমি
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পূবালী ব্যাংকের সিডিএ করপোরেট শাখার তৎকালীন জুনিয়র অফিসার রাজিবুর রহমান শেখ মুজিব রোড শাখা থেকে ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর তিনি তিনজন নিরাপত্তারক্ষীসহ গাড়িযোগে সীতাকুণ্ড শাখায় যান এবং সেখান থেকে আরও ৮১ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।
পরবর্তীতে ওই টাকা নিয়ে তারা চট্টগ্রাম নগরের সিডিএ করপোরেট শাখার উদ্দেশে রওনা হন। কিছু সময় পর রাজিবুর রহমান ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানান, গাড়িতে থাকা একটি বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে প্রায় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিল।
ঘটনার পরপরই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করা হয়। পরে সিডিএ করপোরেট শাখার তৎকালীন সহকারী মহাব্যবস্থাপক তৌফিকুর রহমান বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।
২০২২ সালের ১৬ মে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। মোট সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত রায় প্রদান করেন।
রায়ের সারসংক্ষেপ
| আসামির নাম | পদ/পরিচয় | রায় | অর্থদণ্ড |
|---|---|---|---|
| বিজয় কুমার দাশ | সাবেক গাড়িচালক | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ হাজার টাকা/কারাদণ্ড) |
| রাজিবুর রহমান | সাবেক জুনিয়র অফিসার (ক্যাশ) | ১০ বছর কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ বছর অতিরিক্ত কারাদণ্ড) |
| মো. আশিকুর রহমান | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ বছর অতিরিক্ত কারাদণ্ড) |
| তানজুর রহমান | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ বছর অতিরিক্ত কারাদণ্ড) |
| মাজহারুল ইসলাম | নিরাপত্তারক্ষী | ১০ বছর কারাদণ্ড | ১০ লাখ টাকা (অনাদায়ে ১০ বছর অতিরিক্ত কারাদণ্ড) |
এই রায়কে কেন্দ্র করে ব্যাংক খাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, নগদ অর্থ পরিবহন প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ নজরদারির বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন ঘটনায় ভবিষ্যতে অর্থ পরিবহন ব্যবস্থায় আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
