বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চ থেকে টাকার ধীর অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্যের উর্ধ্বমুখী চাপের প্রেক্ষাপটে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইরানভিত্তিক যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পূর্বের স্থিতিশীল বিনিময় হার রক্ষার নীতি থেকে সরে এসেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য দুটি মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে – মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা। উচ্চতর আমদানি ব্যয় রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে এবং এটি মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি করতে পারে।
Table of Contents
ধীর অবমূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকার ধীর অবমূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়ার ফলে অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে। এটি রিজার্ভ সুরক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাজার অস্থিরতা মোকাবেলায় সহায়ক হবে।”
নতুন সরকারের সম্প্রসারক বাজেট নীতি এবং নির্বাচনের পর ঋণ ও ব্যবসায় সম্প্রসারণের চাহিদা টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই সময়ে ধীর অবমূল্যায়ন গ্রহণ করা রক্ষণশীল, কিন্তু জরুরি একটি পদক্ষেপ।
টাকার সম্ভাব্য অবমূল্যায়ন
৮ মার্চ থেকে ডলারের তুলনায় টাকার মান ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্বে ১২২.৩০ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। ২৯ মার্চের রিয়েল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট (REER) ১২৬ টাকা ছিল, যা নির্দেশ করছে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ৩.২৪ টাকার অবমূল্যায়নের সুযোগ আছে।
নিচে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও টাকার অবমূল্যায়ন সংক্রান্ত তথ্যের একটি টেবিল দেওয়া হলো:
| বিষয় | ২৯ মার্চ, ২০২৬ | দুই সপ্তাহ পূর্বে | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ | ২৯.২৯ বিলিয়ন ডলার | ২৯.৫৯ বিলিয়ন ডলার | পতনের সূচক |
| ডলার প্রতি টাকার বিনিময় হার | ১২৩.০০ টাকা | ১২২.৩০ টাকা | ধীর বৃদ্ধি |
| রিয়েল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট (REER) | ১২৬ টাকা | ১২৫.৫ টাকা | অবমূল্যায়নের সুযোগ বিদ্যমান |
| বিনিময় হার সীমা (উচ্চ) | ১৩০ টাকা | – | ৫.৬% পর্যন্ত অবমূল্যায়ন সম্ভব |
অর্থনৈতিক প্রভাব
টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি হ্রাস পেতে পারে।
একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী, তেল ও বিনিময় হার শকের সংমিশ্রণে ২০২৬ সালের মধ্যে রিজার্ভ প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের কমে যেতে পারে। একই সময় মুদ্রাস্ফীতি ০.৫ থেকে ২ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি তেল আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক মনিটরি ফান্ডের কাছে সহায়তা চাইবে। এটি চলমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রোগ্রামের বাইরে আলাদা সহায়তা হিসেবে কার্যকর হবে।
বাজারের চ্যালেঞ্জ
অবমূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাঙ্কগুলিকে মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ডলার লেনদেন করতে বলছে। তবে আন্তর্জাতিক তত্বাবধায়ক সংস্থা মনে করাচ্ছে, বিনিময় হার অবশ্যই বাজারভিত্তিক হওয়া উচিত।
এই পদক্ষেপ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি শকের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মোটকথা, টাকার ধীর অবমূল্যায়ন নীতি বর্তমান পরিস্থিতিতে রক্ষণশীল, কিন্তু প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
