আজ ৪ এপ্রিল—বাংলার ইতিহাসে এক বেদনাময় স্মরণদিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় নিজ প্রতিষ্ঠিত সাধনা ঔষধালয়ের সদর দপ্তরের সামনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন প্রখ্যাত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ, শিক্ষাবিদ ও মানবসেবক যোগেশচন্দ্র ঘোষ। জ্ঞানচর্চা, মানবকল্যাণ এবং দেশীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে তার অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
১৮৮৭ সালে শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটে জন্মগ্রহণ করেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ। পিতা পূর্ণচন্দ্র ঘোষের আদর্শিক শিক্ষায় বেড়ে ওঠা এই মেধাবী ব্যক্তি শৈশব থেকেই অধ্যবসায় ও জ্ঞানান্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯০২ সালে ঢাকার কে. এল. জুবিলী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৯০৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে এফ.এ. পাস করার পর তিনি কুচবিহার কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে রসায়নশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
নিম্নে তার শিক্ষা ও কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১৮৮৭, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর |
| এন্ট্রান্স | ১৯০২, কে. এল. জুবিলী স্কুল, ঢাকা |
| এফ.এ. | ১৯০৪, জগন্নাথ কলেজ |
| বিএ | কুচবিহার কলেজ |
| এমএ (রসায়ন) | ১৯০৮ |
| কর্মজীবন শুরু | ভাগলপুর কলেজ (১৯০৮–১৯১২) |
| অধ্যাপক | জগন্নাথ কলেজ (দীর্ঘ সময়) |
| অধ্যক্ষ | ১৯৪৭–১৯৪৮, জগন্নাথ কলেজ |
শিক্ষকতা ছিল তার জীবনের ব্রত। ভাগলপুর কলেজে কর্মজীবন শুরু করে তিনি জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘদিন রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একাধারে কঠোর শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন শিক্ষক এবং মানবিক অভিভাবক। ১৯৪৭-৪৮ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার নেতৃত্বগুণ, দূরদর্শিতা এবং নৈতিক দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবসর গ্রহণের পরও তিনি জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় সক্রিয় ছিলেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার স্বীকৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য—তিনি লন্ডন কেমিক্যাল সোসাইটির ফেলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্য হিসেবে সম্মানিত হন। এই অর্জন তার মেধা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মানবসেবা। দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯১৪ সালে ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সাধনা ঔষধালয়। দেশীয় ভেষজ উপাদান দিয়ে প্রস্তুত ওষুধের মাধ্যমে তিনি চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি বিকল্প ও কার্যকর ধারা তৈরি করেন। তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে রোগের কারণ, লক্ষণ এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়।
তার জীবনের মূল দর্শন ছিল—চিকিৎসা শুধু পেশা নয়, এটি মানবসেবার একটি মহান মাধ্যম। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আজীবন মানুষের দুঃখ লাঘবে কাজ করে গেছেন।
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তার শারীরিক জীবনাবসান হলেও তার আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা এবং মানবসেবার চেতনা আজও অমলিন। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—জ্ঞান তখনই পরিপূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
প্রয়াণ দিবসে এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
