অস্ট্রেলিয়ায় স্বাস্থ্যবিমা দেরিতে নেওয়ায় অনুশোচনা বাড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে

অস্ট্রেলিয়ায় বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা দেরিতে নেওয়া বা একেবারেই না নেওয়ার প্রবণতা এখন বড় ধরনের সামাজিক ও আর্থিক উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, প্রতি পাঁচজন অস্ট্রেলীয়ের মধ্যে প্রায় একজন এখন মনে করছেন—সময়ের আগে স্বাস্থ্যবিমা গ্রহণ করলে তারা আর্থিক ও চিকিৎসাগত ঝুঁকি অনেকটাই এড়াতে পারতেন। একই সময়ে স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণ সংস্থা Finder পরিচালিত জরিপে ১,০১১ জন অংশগ্রহণকারীর মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯ শতাংশ অস্ট্রেলীয়—যা আনুমানিক ৪১ লাখ মানুষের সমান—স্বীকার করেছেন যে তারা দেরিতে স্বাস্থ্যবিমা নেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু ব্যক্তিগত অনুশোচনার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপেরও ইঙ্গিত দেয়।

অনুশোচনার মূল কারণ

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যবিমা না থাকায় অনেকেই দৈনন্দিন চিকিৎসা ব্যয় থেকে শুরু করে বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটে আর্থিক সুরক্ষা হারিয়েছেন। ছোটখাটো চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেমন দাঁতের চিকিৎসা বা সাধারণ পরীক্ষার খরচ বহন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি গুরুতর অসুস্থতার সময় বড় অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় বহন করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিচের সারণিতে অনুশোচনার কারণসমূহ উপস্থাপন করা হলো—

অনুশোচনার ধরনশতাংশ
ছোটখাটো চিকিৎসা ব্যয়ে কভারেজ না থাকা১২%
বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় কভারেজ না পাওয়া৭%
মোট অনুশোচনাকারী১৯%

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি “আন্ডারইনসুরেন্স” বা অপর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। অর্থাৎ, অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় অপ্রত্যাশিত স্বাস্থ্য ব্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ছে।

প্রিমিয়াম বৃদ্ধি: নতুন চাপ

এদিকে স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার সম্প্রতি বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম গড়ে ৪.৪১ শতাংশ বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছেন, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে একজন গড় বিমাধারী মাসে প্রায় ১৬৪.২ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৩৮ অস্ট্রেলিয়ান ডলার) প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন। এই বৃদ্ধির ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৬.৯ মার্কিন ডলার (১২৬ অস্ট্রেলিয়ান ডলার) ব্যয় বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ‘গোল্ড-টিয়ার’ পলিসির প্রিমিয়াম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা উচ্চ আয়ের বাইরে থাকা অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

বিমা গ্রহণের বর্তমান চিত্র

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বিমা গ্রহণের প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়—

বিমা অবস্থাশতাংশ
সবসময় বিমা ছিল এবং সন্তুষ্ট৩৯%
কখনো বিমা নেননি২৭%
সবসময় বিমা ছিল, তবে অসন্তুষ্ট১৫%

এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, যদিও উল্লেখযোগ্য একটি অংশ স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে সন্তুষ্ট, তবুও বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো বিমার বাইরে রয়েছে বা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।

প্রজন্মভিত্তিক পার্থক্য

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে—তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্যবিমা না নেওয়ার অনুশোচনা বেশি। জেনারেশন জেড-এর ১৬ শতাংশ জানিয়েছেন, গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার পর তারা বিমা না নেওয়ার জন্য আফসোস করছেন। তুলনামূলকভাবে মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই হার ৭ শতাংশ, জেন এক্স-এর মধ্যে ৩ শতাংশ এবং বেবি বুমারদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে “আমি এখন সুস্থ আছি” ধরনের মানসিকতা এবং খরচ বাঁচানোর প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি কখনও পূর্বাভাস দিয়ে আসে না—এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারায় তারা পরে আর্থিক চাপে পড়ছেন।

উপসংহার

সমগ্র চিত্রটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, স্বাস্থ্যবিমা শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়—এটি একটি প্রয়োজনীয় সুরক্ষা কাঠামো। প্রিমিয়াম বৃদ্ধির কারণে অনেকেই বিমা গ্রহণে বিলম্ব করছেন, কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তই বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Finder-এর কনজ্যুমার সেন্টিমেন্ট ট্র্যাকার, যা ২০১৯ সালের মে মাস থেকে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে, তার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী বিমা নীতির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি।