বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের অবদান গভীর হলেও স্মরণে তারা প্রায় অনুপস্থিত। তেমনই এক বিস্মৃত আলোকবর্তিকা শহীদ সাবের—যার জীবন সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও বেদনাবিধুর পরিণতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া এই মানুষটি আমাদের ইতিহাসের এক করুণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছেন।
শহীদ সাবেরের প্রকৃত নাম একেএম শহীদুল্লাহ। ১৯৩০ সালের ১৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁ গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও সংস্কৃতিমনা। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ঈদগাঁ প্রাইমারি স্কুলে, পরে পিতার কর্মসূত্রে কলকাতায় গিয়ে হেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে এসে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন।
কৈশোর থেকেই তাঁর সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। কলকাতার পার্ক সার্কাসে ‘ছোটদের আসর’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেয়াল পত্রিকা ‘ছন্দশিখা’ সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামে ‘মুকুল ফৌজ’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি সমাজসচেতন কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
কলেজজীবনে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫০ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমননীতির শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। কারাগারের প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি থেমে থাকেননি; বরং রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে বন্দী অবস্থায় থেকেই ১৯৫১ সালে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দীর্ঘ চার বছর কারাবাসের পর ১৯৫৪ সালে মুক্তি লাভ করেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৫৫ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে শিগগিরই সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ফেডারেল ইনফরমেশন সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন, কিন্তু রাজনৈতিক অতীতের কারণে রাষ্ট্রীয় চাকরি থেকে বঞ্চিত হন—যা তাঁর জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে থাকে।
১৯৫৮ সালের শেষদিকে তাঁর জীবনে নেমে আসে এক গভীর অন্ধকার। মানসিক অসুস্থতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, এবং জীবনের বাকি সময় তিনি আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তবুও তাঁর সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি।
নিচে তাঁর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রকৃত নাম | একেএম শহীদুল্লাহ |
| জন্ম | ১৮ ডিসেম্বর ১৯৩০ |
| জন্মস্থান | ঈদগাঁ, কক্সবাজার |
| শিক্ষা | হেয়ার স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, জগন্নাথ কলেজ |
| পেশা | সাংবাদিক, লেখক |
| উল্লেখযোগ্য কর্ম | ‘আরেক দুনিয়া থেকে’, ‘এক টুকরো মেঘ’, ‘ক্ষুদে গোয়েন্দার অভিযান’ |
| অনুবাদ গ্রন্থ | ‘ইসকাবনের বিবি’, ‘পাগলের ডায়েরি’, ‘কালো মেয়ের স্বপ্ন’ |
| মৃত্যু | ৩১ মার্চ ১৯৭১ |
শহীদ সাবেরের সাহিত্যকর্মে এক সংবেদনশীল মন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর কারাগারে লেখা ‘আরেক দুনিয়া থেকে’ গ্রন্থে বন্দী জীবনের অভিজ্ঞতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি গল্পসংকলন ‘এক টুকরো মেঘ’-এ ফুটে উঠেছে সমাজ ও মানুষের অন্তর্গত বেদনা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে, ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দৈনিক ‘সংবাদ’ অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। সেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে শহীদ হন তিনি। তাঁর মৃত্যু ছিল নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গ—যেন তাঁর জীবনকাহিনিরই একটি বেদনাময় সমাপ্তি।
শহীদ সাবের কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, এক অবহেলিত ইতিহাসের প্রতিনিধি। তাঁর আত্মত্যাগ ও সৃজনশীল অবদান আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবুও বিস্মৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকা এই মানুষটিকে নতুন করে স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আজ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়—ভুলে যাওয়ার অন্ধকার ভেদ করে, স্মৃতির আলোয় তাঁকে ফিরিয়ে আনা হোক বারবার।
