বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেসব নারী তাঁদের কলম, চেতনা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন এমন এক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব, যিনি সত্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার পক্ষে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ ফেনী জেলার ছোট কল্যানপুরে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি গভীর আকর্ষণ গড়ে ওঠে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েই তিনি গল্প ও কবিতা লেখার মাধ্যমে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। অল্প বয়সে বিবাহিত জীবনে প্রবেশের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি এলেও তিনি দমে যাননি। পরবর্তীতে প্রবল আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ় মনোবলে তিনি পুনরায় পড়াশোনায় ফিরে আসেন, যা তাঁর অসাধারণ মানসিক শক্তির পরিচায়ক।
পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি একটি নারী বিষয়ক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সে সময়ের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তাঁর চিন্তা-চেতনা ও লেখালেখিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
১৯৬৯ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে এবং শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় প্রকাশ করেন একটি সাহসী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন পত্রিকা। এই প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি সরাসরি অন্যায়, শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক—যেখানে তাঁর কলম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্র।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সেলিনা পারভীন গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন এবং তথ্য ও সমর্থন দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর প্রকাশনার কারণে তিনি পাকিস্তানি দোসর বাহিনীর নজরে আসেন এবং তাঁকে হত্যা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী তাঁকে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে অপহরণ করে। পরদিন ১৪ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন—অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করা হয়, যেখানে তাঁর চোখ বাঁধা এবং পায়ে শীতের মোজা ছিল—যা সেই নৃশংসতার ভয়াবহ সাক্ষ্য বহন করে।
শহীদ সেলিনা পারভীন শুধু একজন সাংবাদিক নন; তিনি ছিলেন সাহস, সততা ও দেশপ্রেমের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কত গভীর ও বেদনাদায়ক।
সংক্ষিপ্ত জীবনকাল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৩১ | ফেনী জেলার ছোট কল্যানপুরে জন্ম |
| ষষ্ঠ শ্রেণি | সাহিত্যচর্চা শুরু (গল্প ও কবিতা লেখা) |
| প্রারম্ভিক কর্মজীবন | নারী বিষয়ক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ |
| ১৯৬৯ | স্বাধীনচেতা পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা |
| ১৯৭১, ১৩ ডিসেম্বর | আল-বদর বাহিনী কর্তৃক অপহরণ |
| ১৯৭১, ১৪ ডিসেম্বর | শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে হত্যা |
আজও সেলিনা পারভীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যের পথে দাঁড়ানো সহজ নয়, কিন্তু সেটিই ইতিহাসে চিরস্থায়ী আলো জ্বালায়।
