প্রবাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জন নিহত

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারসহ জেলা জুড়ে মানব পাচারের ছায়া আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ভূমধ্যসাগরে প্রবাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় সুনামগঞ্জের ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফাহিম আহমদ (২০)ও রয়েছেন। পরিবারের একজন আত্মীয়ের মাধ্যমে ফাহিমকে গ্রিস পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সাগরপথে তিনি বেঁচে থাকতে পারেননি।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার চক্রের কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। প্রবাসে যাওয়ার চুক্তির মোট টাকার অর্ধেক আগে নিতে হয়, বাকি টাকা পরিশোধ করতে হয় যখন যাত্রা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হয় বা প্রলোভনে পড়ে সন্তানদের অবৈধ পথে বিদেশ পাঠাতে।

ফাহিমের মামা জামাল উদ্দিন লিবিয়া হয়ে গ্রিসে লোক পাঠানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁর ভাই আবদুর রহিম বা জসিম উদ্দিন বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। উভয়ের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জে মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যালে মামলা রয়েছে।

ফাহিমের সঙ্গে একই চক্র আরও কয়েকজন যুবককে প্রবাস পাঠিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে একজনের পরিবার ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। ফাহিমের চাচা তাইজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘আমরা মূলত এইভাবে অবৈধ পথে ফাহিমকে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে ছিলাম না।’ তিনি অতিরিক্ত কোনো তথ্য দেননি।

বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খান বলেন, উন্নত জীবনের আশা এবং দালালদের প্রলোভনে পড়ে এলাকার মানুষরা অবৈধভাবে ইউরোপে যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় ইউএনওরা দালালদের তালিকা তৈরি করে পুলিশকে দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার এবং আর্থিকভাবে অসহায় পরিবারগুলোর সহযোগিতার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী জানিয়েছেন, জেলার সব উপজেলাতেই দালাল চক্র সক্রিয়। বিশেষ করে জগন্নাথপুর, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, দিরাই এবং দোয়ারাবাজারে এই কর্মকাণ্ড বেশি। তিনি বলেন, ‘দালাল চক্রের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়া এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।’

পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং গোপন সূত্রের মাধ্যমে দালালদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পরিবার কেউ মামলা না করলে পুলিশই বাদী হয়ে মামলা করবে।

নিচের টেবিলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় মানব পাচারের তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

উপজেলাক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিমামলা প্রস্তুতদালাল সক্রিয়তামন্তব্য
জগন্নাথপুরহ্যাঁউচ্চইউএনও তালিকা পুলিশে দিয়েছে
দিরাইহ্যাঁউচ্চতদন্ত প্রক্রিয়া চলমান
ছাতকনামাঝারিস্থানীয় সচেতনতা বাড়ছে
শান্তিগঞ্জনামাঝারিপরিবার সমর্থন কার্যকর
দোয়ারাবাজারনাউচ্চফাহিম আহমদ নিহত

প্রশাসন এবং স্থানীয় কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তা নিশ্চিত করছে। মানব পাচারের ভয়াবহ চক্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার এবং সচেতনতার গুরুত্ব বাড়ছে।