অস্ট্রেলিয়ায় ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমেই নড়বড়ে করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিমা খাত নতুন করে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, দেশটির প্রায় ২৭ শতাংশ বিমাধারী নাগরিক তাদের নিয়মিত ব্যয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যবিমাকে শীর্ষ তিনটি চাপের খাতের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এতে বোঝা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের তালিকায় স্বাস্থ্যবিমার অবস্থান এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে কতটা উদ্বেগজনক।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ফাইন্ডারের পরিচালিত জরিপে অংশ নেন ৮৮৪ জন পলিসিধারী। তাদের মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি স্বীকার করেছেন যে, গত ১২ মাসে তারা একবারও তাদের স্বাস্থ্যবিমা পলিসি পর্যালোচনা বা তুলনা করেননি। অথচ বাস্তবতা হলো—পরিবর্তিত আর্থিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পলিসি হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি। এই অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সাম্প্রতিক প্রিমিয়াম বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে অস্ট্রেলিয়া সরকার স্বাস্থ্যবিমা প্রিমিয়াম গড়ে ৪.৪১ শতাংশ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। গত প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। ফলে আগে থেকেই ব্যয়চাপে থাকা পরিবারগুলোকে এখন আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা তাদের মাসিক বাজেটে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
অস্ট্রেলিয়ান প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি (APRA)-এর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির স্বাস্থ্যবিমা খাত অত্যন্ত বিস্তৃত এবং জনজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ মানুষ (৪৫.৬%) বেসরকারি হাসপাতাল কভারের আওতায় রয়েছেন। পাশাপাশি ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ (৫৫.৩%) অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা কভার বা ‘এক্সট্রাস কভার’ গ্রহণ করেছেন। এই বিশাল গ্রাহকগোষ্ঠীর ওপর প্রিমিয়াম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে।
নিচে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো—
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| স্বাস্থ্যবিমাকে শীর্ষ ৩ উদ্বেগের বিল হিসেবে বিবেচনা করেন | ২৭% |
| ১২ মাসে পলিসি পর্যালোচনা করেননি | ২০%+ |
| ২০২৬ সালে গড় প্রিমিয়াম বৃদ্ধির হার | ৪.৪১% |
| হাসপাতাল কভারধারী | ১.২৬ কোটি (৪৫.৬%) |
| এক্সট্রাস কভারধারী | ১.৫৩ কোটি (৫৫.৩%) |
ফাইন্ডারের বীমা বিশেষজ্ঞ টেইলর ব্ল্যাকবার্নের মতে, অনেক গ্রাহক এমন পলিসি ধরে রেখেছেন যা তাদের বর্তমান স্বাস্থ্যচাহিদা বা আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আয়-ব্যয়ের কাঠামো বদলায়, কিন্তু সেই অনুযায়ী পলিসি পরিবর্তন না করলে অপ্রয়োজনীয় সুবিধার জন্য অর্থ গচ্চা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কখনো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন গ্রাহকরা।
তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানিগুলো নতুন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে থাকে—যেমন ৭০০ ডলার পর্যন্ত ক্যাশব্যাক, এয়ারলাইন পয়েন্ট কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনামূল্যে কভারেজ। কিন্তু পুরোনো গ্রাহকরা সাধারণত এসব সুবিধা পান না। ফলে যারা দীর্ঘদিন ধরে একই পলিসিতে রয়েছেন, তারা তুলনামূলকভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিমাকে একটি স্থির বা অপরিবর্তনীয় ব্যয় হিসেবে না দেখে বরং এটি প্রতি বছর পর্যালোচনা করা উচিত। পরিবারের আয়, ব্যয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পলিসি পরিবর্তন করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় সম্ভব। বিশেষ করে বর্তমান উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সময়ে সচেতনতা, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই হতে পারে আর্থিক চাপ মোকাবিলার কার্যকর উপায়।
