টিকা অব্যবস্থাপনায় শিশুদের ওপর হামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজরে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত এবং সেবার সীমাবদ্ধতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে প্রায় দুই কোটি এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকা সরকারের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে শিশুদের মধ্যে সেগুলো প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী ডিসেম্বরে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ বের করে এমআর টিকা কেনা হলেও ২০২৫ সালের জুনের পর টিকার সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। এর ফলে প্রায় নয় মাস ধরে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের অনেকেই হাম এবং রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাচ্ছে না, এবং দেড় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন হয়নি।

১৯৮৮ সালে সরকারি উদ্যোগে দেশে এমআর টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “গ্যাভি গত মাসে দুই কোটি এমআর টিকা পাঠিয়েছে। কিন্তু জনবল, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক এবং বাজেটের অভাবে টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে গ্যাভিকে চিঠি দিয়েছি।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় টিকার জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গত ১১ দিনে এখানে ৩৩টি শিশু মারা গেছে। মূল কারণ ছিল ভেন্টিলেটর ও যান্ত্রিক ত্রুটি।”

দেশের ১২টি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। প্রধানত ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোর জেলায় রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য জেলা যেমন নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজিপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

জেলার ভিত্তিতে হাম আক্রান্ত শিশু সংখ্যা

জেলাভর্তি শিশু সংখ্যামৃত্যু শিশু সংখ্যামন্তব্য
ঢাকা২১০১০রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি
ময়মনসিংহ১০৬চলতি মাসে বৃদ্ধি
রাজশাহী১২৩১২মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রতিবেদিত
চট্টগ্রাম৪৫স্থানীয় হাসপাতাল থেকে তথ্য
অন্যান্য১০০নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা, পটুয়াখালী

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ পড়া এবং শিশুদের অসম্পূর্ণ টিকা। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও অপুষ্টিও ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) সিএসও চেয়ারম্যান ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, “একাধিক টিকার সংকট এবং ইপিআই কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে শিশুদের মধ্যে হাম বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকার ফলে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও গ্যাভি যৌথ উদ্যোগে শীঘ্রই টিকার সরবরাহ পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা করছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রতিরোধ করা যায় এবং শিশুরা সুরক্ষিত থাকে।