বাণিজ্যের আড়ালে কোটি কোটি ডলার পাচার

বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার—or বর্তমান বাজারদরে ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি—অবৈধভাবে বিদেশে প্রেরণ হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। এই তথ্য এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

পাচারের মূল কারণ ও পদ্ধতি

জিএফআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অর্থ পাচারের মূল উপায় হলো আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে মূল্য কারসাজি করা। অর্থাৎ পণ্য বা সেবার প্রকৃত মূল্য কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেখানো হয়, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে বাইরে চলে যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের লেনদেন সাধারণত ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও আর্থিক খাতের মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনও একই চিত্র ফুটিয়ে তোলে। সেখানে বলা হয়, ২০০৯–২০২৩ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার—or ২৮ লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ—বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

অর্থ পাচারের বৈশ্বিক চিত্র

জিএফআই–এর প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থ পাচারের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। মূল তথ্যগুলো নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলোঃ

দেশদশকের মোট পাচার (ট্রিলিয়ন ডলার)বার্ষিক মোট বাণিজ্যের শতকরা হার (%)
চীন৬.৯৬২৫%
থাইল্যান্ড১.১৮১৫% (প্রায়)
ভারত১.০৬২২% (প্রায়)
বাংলাদেশ০.৬৮৩১৬%

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট পাচার হওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক—৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার—উন্নত অর্থনীতির দেশে গেছে। অর্থ পাচার না থামলে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হয়, কর রাজস্ব কমে যায় এবং জনসেবা ও অবকাঠামো বিনিয়োগে প্রয়োজনীয় অর্থ সংকুচিত হয়।

সমাধান ও সুপারিশ

জিএফআই–এর সুপারিশ অনুযায়ী, পাচার রোধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:

  1. শুল্ক ব্যবস্থাপনায় জোরদার কৌশল।
  2. আঞ্চলিক চুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি।
  3. মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি।
  4. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার রোধ করা না গেলে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক সেবা ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই প্রতিবেদনের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশে অর্থ পাচারের সমস্যা কেবল আর্থিক নয়, এটি দেশের নীতি ও সুশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।