দারিদ্র্য নির্ধারণে আয় না জীবনবাস্তবতা?

বাংলাদেশে দারিদ্র্য নির্ধারণের প্রশ্নটি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন মৌলিক এক দ্বিধা—মানুষের দারিদ্র্য কি কেবল আয় দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি তার বাস্তব জীবনযাত্রার মান, ব্যয় ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে বিচার করা উচিত? প্রচলিত পদ্ধতিতে দারিদ্র্য নির্ধারণে খাদ্য গ্রহণ, ক্যালরি চাহিদা, আয় ও ভোগব্যয়কে প্রধান সূচক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনের বহুমাত্রিকতা কি এই সীমিত সূচকে প্রতিফলিত হয়?

সমাজের ভিন্ন স্তরের দুটি বাস্তব উদাহরণ এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। একটি শ্রমজীবী পরিবারে গৃহকর্মী, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক ও পরিবহন সহকারীর সম্মিলিত মাসিক আয় প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার বেশি। সীমিত ব্যয়, স্বল্প ভাড়া ও কিছু ক্ষেত্রে খাদ্য সুবিধা পাওয়ায় তারা প্রতি মাসে প্রায় দশ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। কয়েক বছরের মধ্যে তারা গ্রামে জমি কেনার মতো সক্ষমতাও অর্জন করেছে।

অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিত এক তরুণ, যিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, মাসে প্রায় আটাশ হাজার পাঁচশ টাকা আয় করেও রাজধানীতে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মাস শেষ হওয়ার আগেই তাকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, এমনকি পারিবারিক সম্পদ বিক্রির মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে।

এই দুই চিত্র আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—কে প্রকৃতপক্ষে বেশি দরিদ্র? নিচের সারণিতে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো—

বিবরণশ্রমজীবী পরিবারশিক্ষিত তরুণ
মাসিক আয়প্রায় ৫০,০০০+ টাকাপ্রায় ২৮,৫০০ টাকা
ব্যয়সীমিতঅত্যন্ত বেশি
সঞ্চয়প্রায় ১০,০০০ টাকানেই
সম্পদ অর্জনজমি ক্রয় সম্ভবসম্পদ বিক্রয়
আর্থিক স্থিতিতুলনামূলক স্থিতিশীলঅনিশ্চিত ও ঋণনির্ভর

এই বৈপরীত্য দেখায় যে, কেবল আয় দিয়ে দারিদ্র্য নির্ধারণ করলে প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে “কর্মরত দরিদ্র” নামে একটি নতুন শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা নিয়মিত আয় করেও উচ্চ ব্যয়ের চাপে আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় থাকে। বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

সরকার ভর্তুকিমূল্যে পণ্য ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে প্রায় এক কোটি পরিবারকে সহায়তা দিচ্ছে। তবে এই সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার বাদ পড়ে যায়, যারা দৃশ্যত দরিদ্র না হলেও বাস্তবে চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য নির্ধারণে কয়েকটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, আয় ও ব্যয়ের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শহর ও গ্রামের জন্য পৃথক দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করা উচিত। তৃতীয়ত, একটি আধুনিক ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলে প্রকৃত উপকারভোগীদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতে প্রচলিত রেশনিং ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রেশনিং ব্যবস্থা পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যা নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত উভয় শ্রেণির জন্য সহায়ক হবে।

সবশেষে বলা যায়, দারিদ্র্য কোনো একমাত্রিক ধারণা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সময় এসেছে দারিদ্র্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার—যেখানে কেবল আয় নয়, মানুষের বাস্তব জীবনই হবে মূল বিবেচ্য।

লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক – খবরওয়ালা ও জি-লাইভ ২৪

এবিএম জাকিরুল হক টিটন