এশিয়া-প্যাসিফিক (এপিএসি) অঞ্চলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতারণার মুখোমুখি হচ্ছে। সাম্প্রতিক “লেক্সিসনেক্সিস রিস্ক সলিউশনস সাইবারক্রাইম রিপোর্ট ২০২৫” অনুসারে, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার যত দ্রুত হচ্ছে, ততই প্রতারণার মাত্রা বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত জালিয়াতি এবং কৃত্রিম পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণা এখন ব্যবসার জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
Table of Contents
বিশ্বজুড়ে সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রডের ভয়াবহতা
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ১১৬ বিলিয়ন ডিজিটাল লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রড বা কৃত্রিম পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণা আট গুণ বেড়েছে। বর্তমানে এটি মোট ডিজিটাল জালিয়াতির প্রায় ১১ শতাংশ দখল করছে। এই ধরনের প্রতারণায় অপরাধীরা বাস্তব ও ভুয়া তথ্য মিশিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করে, যা অনেক সময় “ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আইডি” নামে পরিচিত।
এই কৃত্রিম পরিচয়গুলোতে বাস্তব ব্যক্তি না থাকায় কোনো স্বাভাবিক সতর্কতা ব্যবস্থা কাজ করে না। প্রতারকরা প্রথমে এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে গ্রাহক যাচাই (KYC) পাস করে, তারপর বীমা পলিসি বা আর্থিক সেবা গ্রহণ করে দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্য লেনদেনের ইতিহাস তৈরি করে। পরবর্তীতে তারা বড় অঙ্কের ভুয়া দাবি উত্থাপন করে আর্থিক সুবিধা আদায় করে।
লাতিন আমেরিকায় এই ধরনের প্রতারণা ইতোমধ্যেই মোট জালিয়াতির প্রায় ৪৮.৩ শতাংশ দখল করেছে, যা পরিস্থিতির গুরুতরতা প্রমাণ করে।
স্বয়ংক্রিয় বট আক্রমণের বিস্তার
২০২৫ সালে ক্ষতিকর বট বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারভিত্তিক আক্রমণ ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক টুলগুলো এখন মানুষের আচরণ অনুকরণ করতে সক্ষম, যেমন: মাউস কার্সরের নড়াচড়া, টাইপিং প্যাটার্ন বা স্ক্রলিং। ফলে প্রচলিত আচরণভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাঁকি খাচ্ছে। বিশেষ করে ডেস্কটপ ব্রাউজারভিত্তিক আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রথম পক্ষের জালিয়াতি: প্রধান হুমকি
বিশ্বব্যাপী এখনো সবচেয়ে বড় জালিয়াতির উৎস হিসেবে রয়েছে “ফার্স্ট-পার্টি ফ্রড”, যেখানে প্রকৃত গ্রাহক ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করে আর্থিক সুবিধা নেয়। এটি মোট জালিয়াতির প্রায় ৩৮.৩ শতাংশ। ইএমইএ অঞ্চলে এই ধরনের প্রতারণা অর্ধেকের বেশি জালিয়াতির জন্য দায়ী।
এপিএসি অঞ্চলের ঝুঁকি
এশিয়া-প্যাসিফিকে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি জালিয়াতির হারও বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আক্রমণের হার এখন ১.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এটি কম মনে হতে পারে, বিপুল লেনদেনের কারণে আর্থিক প্রভাব অত্যন্ত বড়। তাই এই অঞ্চলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষভাবে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
প্রধান পরিসংখ্যান এক নজরে
| সূচক | পরিমাণ/হার |
|---|---|
| মোট বিশ্লেষিত লেনদেন (২০২৫) | ১১৬ বিলিয়ন |
| সিনথেটিক আইডেন্টিটি ফ্রড বৃদ্ধি | ৮ গুণ |
| মোট জালিয়াতিতে এর অংশ | ১১% |
| স্বয়ংক্রিয় বট আক্রমণ বৃদ্ধি | ৫৯% |
| প্রথম পক্ষের জালিয়াতির হার | ৩৮.৩% |
| লাতিন আমেরিকায় সিনথেটিক ফ্রড | ৪৮.৩% |
| এপিএসি অঞ্চলে আক্রমণের হার | ১.৭% |
করণীয় ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, শক্তিশালী পরিচয় যাচাইকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল ছাড়া বিকল্প নেই। না হলে এশিয়া-প্যাসিফিকসহ বৈশ্বিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
