স্বর্ণবাজারে তীব্র অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সে সময় এর চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পায়। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা এই প্রচলিত ধারণার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে, যেখানে অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণ যদি আউন্সপ্রতি চার হাজার একশ মার্কিন ডলারের গুরুত্বপূর্ণ মানসীমার ওপর স্থিতিশীল থাকতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই আশঙ্কা ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, গত সোমবার একদিনেই স্বর্ণের দাম পাঁচ শতাংশেরও বেশি কমে চার হাজার তিনশ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে আসে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় পতন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই পতন বাজারে বিস্ময় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য বাজার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন এবং তা না মানলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার হুঁশিয়ারি দেন। এর জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থান নেয় এবং প্রয়োজন হলে প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত সামরিক ও আর্থিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দেয়। এই পারস্পরিক হুমকি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।

থাইল্যান্ডভিত্তিক একটি শীর্ষস্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে চার হাজার দুইশ পঁয়ত্রিশ এবং চার হাজার একশ মার্কিন ডলারের স্তর দুটি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করছে। তার মতে, যদি দাম চার হাজার একশ ডলারের নিচে নেমে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজারে ধারাবাহিক পতন দেখা দিতে পারে এবং বছর শেষে দাম চার হাজার ডলারের নিচেও নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের স্থানীয় স্বর্ণবাজারেও একই ধরনের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে এক ভরি স্বর্ণের দাম ৭০ হাজার বাহাতের নিচে নেমে প্রায় ৬৫ হাজার বাহাতের কাছাকাছি অবস্থান করছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে দামের ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণ সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির প্রত্যাশা এই ধাতুর আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশা ডলারকে শক্তিশালী করছে, যার ফলে স্বর্ণের ওপর চাপ বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, স্বর্ণের দাম আরও ১০০ থেকে ২০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমতে পারে। তারা বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত জল্পনাভিত্তিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজার স্থিতিশীল হয়ে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরতে পারে, যদিও তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

নিচে স্বর্ণবাজারের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো—

বিষয়বিবরণ
সাম্প্রতিক দাম পতনএকদিনে পাঁচ শতাংশেরও বেশি
বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ স্তর৪,২৩৫ মার্কিন ডলার
প্রধান ঝুঁকির স্তর৪,১০০ মার্কিন ডলার
সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি নিম্নসীমা৪,০০০ ডলারের নিচে
থাইল্যান্ডের স্থানীয় দামপ্রায় ৬৫,০০০ বাহাত প্রতি ভরি
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিবর্তনআরও ১০০–২০০ ডলার পতনের আশঙ্কা

সব মিলিয়ে বৈশ্বিক স্বর্ণবাজার বর্তমানে এক অনিশ্চিত ও অস্থির পর্যায় অতিক্রম করছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট এবং বৈশ্বিক আর্থিক নীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে আগামী দিনে স্বর্ণের দিকনির্দেশনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।