মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মন্তব্য করেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের বাস্তব সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কামরাভা বলেন, ইরানের হাতে এমন সামরিক ও কৌশলগত উপায় রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা চাইলে পুরো প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে অথবা জাহাজ চলাচলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, “হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক বা সীমিতভাবে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হোক—দুই ক্ষেত্রেই ইরানের সক্ষমতা রয়েছে।” তার মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা ইরানের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়ার আরও শক্তিশালী অজুহাত তৈরি করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য—যেখানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারকে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক প্রচেষ্টায় সহায়তার অভিযোগ করেন—তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কামরাভার বিশ্লেষণে, এই ধরনের মন্তব্য ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের রাজনৈতিক ও কৌশলগত যুক্তি আরও জোরালো করেছে। এমনকি ইরান চাইলে নির্দিষ্ট কিছু জাহাজকে অনুমতি দিয়ে বাকিদের চলাচল সীমিত করতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিয়ে আসছে। কিন্তু কামরাভার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই হুমকিকে কখনোই পূর্ণ গুরুত্ব দেয়নি। তার ভাষায়, “অবাক করার বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় ধরে এই হুমকি থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা তা কার্যকরভাবে মূল্যায়ন করেনি।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বানও রয়েছে। ইরান এই প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। নিচের সারণিতে এর গুরুত্ব সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল |
| দৈনিক তেল পরিবহন | বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ২০% |
| প্রধান ব্যবহারকারী দেশ | সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার |
| কৌশলগত গুরুত্ব | বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভরশীল |
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের অচলাবস্থা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা—সবই এর সম্ভাব্য ফলাফল। তাই এই সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
