বেলফাস্ট থেকে বেরগামো—সময়ের ব্যবধানে প্রায় ৬৮ বছর, কিন্তু ইতালি ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফুটবল লড়াই যেন একই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির সামনে আবারও সেই ‘গ্রিন অ্যান্ড হোয়াইট আর্মি’। ২০২৬ বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিতে হলে আজকের নকআউট ম্যাচ জয়ের পাশাপাশি প্লে-অফের ফাইনালেও জয় পেতে হবে জেনারো গাত্তুসোর দলের।
এই ম্যাচটি কেবল একটি খেলা নয়; এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর লড়াই। প্রায় সাত দশক আগে বেলফাস্টে যে স্মৃতি ইতালির ফুটবল ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে, আজ তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
Table of Contents
ফনি যুগ ও কৌশলের সীমাবদ্ধতা
১৯৫৪ বিশ্বকাপের হতাশাজনক বিদায়ের পর ইতালির দায়িত্ব পান কোচ আলফ্রেদো ফনি। তাঁর হাত ধরেই জাতীয় দলে আসে বিখ্যাত ‘কাতেনাচ্চো’ কৌশল—দৃঢ় রক্ষণ, সুইপার এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা। কিন্তু বড় সমস্যা ছিল কার্যকর স্ট্রাইকারের অভাব। ফলে ফনি ভরসা রাখেন ‘অরিয়ুন্দো’ বা বিদেশি বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান ফুটবলারদের ওপর।
উরুগুয়ের আলসিদেস ঘিগিয়া কিংবা হুয়ান শিয়াফিনো, আর্জেন্টিনার পেসাওলার মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা দলে এলেও বয়স ও ফর্মের কারণে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে পারেননি।
১৯৫৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব: ধসের শুরু
ইতালি, পর্তুগাল ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—একই গ্রুপে লড়াই। শুরুটা ভালো হলেও দ্রুত ছন্দ হারায় ইতালি।
| ম্যাচ | ফলাফল | ভেন্যু |
|---|---|---|
| ইতালি বনাম উত্তর আয়ারল্যান্ড | ১-০ জয় | রোম |
| ইতালি বনাম যুগোস্লাভিয়া | ১-৬ হার | অ্যাওয়ে |
| ইতালি বনাম পর্তুগাল | ০-৩ হার | লিসবন |
এই ব্যর্থতার পর ইতালির সামনে বাঁচার শেষ সুযোগ ছিল বেলফাস্ট ম্যাচ।
‘ব্যাটল অব বেলফাস্ট’
১৯৫৭ সালের ৪ ডিসেম্বর—ঘন কুয়াশার কারণে নির্ধারিত ম্যাচটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত হলেও দর্শকদের চাপে একটি অনানুষ্ঠানিক ম্যাচ আয়োজন করা হয়। সেই ম্যাচ ইতিহাসে ‘ব্যাটল অব বেলফাস্ট’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।
গ্যালারি থেকে দর্শকদের মাঠে নেমে আসা, খেলোয়াড়দের ওপর হামলা—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ২-২ ড্র হলেও এটি আনুষ্ঠানিক ম্যাচ না হওয়ায় ইতালির কোনো লাভ হয়নি।
চূড়ান্ত বিপর্যয়
১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় অনুষ্ঠিত ম্যাচেই নির্ধারিত হয় ভাগ্য। প্রতিকূল আবহাওয়া, কর্দমাক্ত মাঠ—সবকিছু যেন ইতালির বিপক্ষে যায়।
প্রথমার্ধেই ২-০ পিছিয়ে পড়ে দলটি। দ্বিতীয়ার্ধে একটি গোল শোধ হলেও ঘিগিয়ার লাল কার্ড পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২-১ হারে ইতালি এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে।
প্রভাব ও পরিণতি
এই পরাজয় ইতালিয়ান ফুটবলে ভূমিকম্পের মতো প্রভাব ফেলে।
| প্রভাব | বিবরণ |
|---|---|
| কোচ পরিবর্তন | আলফ্রেদো ফনি বিদায় |
| ফেডারেশন সংকট | সভাপতি বরখাস্ত |
| খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার | অনেকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ |
| গণমাধ্যম প্রতিক্রিয়া | তীব্র সমালোচনা |
বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের ইতালি সেই সময়ের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হলেও সাম্প্রতিক ইতিহাস মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০১৮ ও ২০২২—টানা দুই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে আজ্জুরিরা। ফলে আজকের ম্যাচে পরাজয় মানে টানা তিনটি বিশ্বকাপ মিস করার অভূতপূর্ব লজ্জা।
বেরগামোর মাঠে তাই এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়—এটি ইতিহাস বদলের সুযোগ।
প্রশ্ন একটাই: ইতালি কি পারবে বেলফাস্টের সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন মুছে নতুন অধ্যায় লিখতে, নাকি আবারও ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে?
