পাবনা জেলার সুজানগর ও ঈশ্বরদী উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা আরও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেল তিনটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মুনছুর খাঁ (৬০)। এর আগে একই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন চায়না খাতুন (৪০) নামে এক গৃহবধূ। এ নিয়ে সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুজনে।
পুলিশ জানিয়েছে, সহিংস এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত সুজানগর ও ঈশ্বরদী থেকে মোট ৩১ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করেনি, যা আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
Table of Contents
সংঘর্ষের পটভূমি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুজানগর উপজেলার হাটখালী ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রদল নেতা রাফিউল ইসলামের অনুসারীদের সঙ্গে মানিকহাট ইউনিয়নের ভিটবিলা গ্রামের বিএনপি-সমর্থক ইসলাম প্রামাণিকের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধ রোববার দিবাগত রাতে উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং সোমবার সকালে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ শুরু হলে চায়না খাতুন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন। গুরুতর আহত মুনছুর খাঁকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
নিহত দুইজনই ইসলাম প্রামাণিকের পক্ষের সমর্থক ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ঈশ্বরদীতে সমান্তরাল সহিংসতা
একই দিনে ঈশ্বরদী উপজেলায়ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নেয়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমানের অনুসারীদের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থকদের মধ্যে রেলগেট ও পোস্ট অফিস মোড় এলাকায় সংঘর্ষ বাধে।
এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হাবিবুর রহমানের নির্বাচনী কার্যালয় ভেঙে ফেলা হয় এবং অন্তত ১৫টি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ছয়টি অগ্নিসংযোগে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
পাবনার সহকারী পুলিশ সুপার (সুজানগর সার্কেল) সাদিক আহমেদ জানিয়েছেন, মুনছুর খাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। নিহত চায়না খাতুনের স্বামী শুকুর আলী একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মমিনুজ্জামান বলেন, এখনো কোনো পক্ষ এজাহার জমা দেয়নি। তবে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংঘর্ষের পর উভয় উপজেলায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রশাসন দাবি করেছে। তবুও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | সুজানগর | ঈশ্বরদী |
|---|---|---|
| সংঘর্ষের কারণ | আধিপত্য বিস্তার | দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব |
| নিহত | ২ জন | ০ |
| আহত | ১০+ | ৩০+ |
| আটক | ১২ | ১৯ |
| ভাঙচুর | ঘরবাড়ি | অফিস, মোটরসাইকেল |
| মামলা | প্রক্রিয়াধীন | হয়নি |
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
পাবনার এই সহিংসতা স্থানীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের দলীয় কোন্দল ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এমন সংঘর্ষের প্রধান কারণ। দ্রুত তদন্ত, দোষীদের চিহ্নিতকরণ এবং কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
