বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর: বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভার প্রতীক

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে আলোকবর্তিকার মতো পথ দেখানো শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী। তিনি কেবল একজন শিক্ষাবিদই নন; তিনি সাহিত্যিক, কবি, গবেষক, অনুবাদক ও গীতিকার—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক মনীষী, যাঁর সৃষ্টিকর্ম জাতির মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৯৩৬ সালের ৯ জানুয়ারি চাঁদপুরের এক সুশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জাহাঙ্গীর। ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তাঁকে সহপাঠীদের মধ্যে আলাদা করে তুলেছিল।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের পথে পাড়ি জমান। ১৯৭৪ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে তার একাডেমিক যাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

কর্মজীবন

জাহাঙ্গীর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষাদান করেন। তার শ্রেণিকক্ষ কেবল পাঠদানের স্থান ছিল না; এটি ছিল চিন্তার মুক্ত পরিসর, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখত।

সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম

অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তিনি। পঞ্চাশের দশকের কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্রদের সঙ্গে—যেমন শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ—তার কণ্ঠ সবচেয়ে তরুণ হলেও প্রতিশ্রুতিশীল ছিল।

১৯৮৩ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধসংকলন ‘মাইকেলের জাগরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ তার বিশ্লেষণী শক্তি ও চিন্তার গভীরতা প্রকাশ করে। ছোটগল্পে সমাজবাস্তবতার তীক্ষ্ণ চিত্র এবং উপন্যাসে মানবজীবনের জটিলতা ও সময়ের টানাপোড়েন ফুটে ওঠে। কবিতায় প্রকাশ পায় নিঃসঙ্গতা, মানবিক বোধ এবং অন্তর্দৃষ্টি।

অনুবাদ ও সম্পাদনা কাজ

জাহাঙ্গীর অনুবাদ সাহিত্যে অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন, ফলে নতুন জগতের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য। পাশাপাশি তিনি বাউল গান, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থও সম্পাদনা করেছেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

তার বহুমাত্রিক অবদানকে স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা।

বিভাগউল্লেখযোগ্য অবদান
শিক্ষাজাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
সাহিত্যকবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ
অনুবাদবিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন রচনার বাংলা রূপান্তর
সম্পাদনাবাউল গান, মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজ-রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থ
স্বীকৃতিবাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, দেশ-বিদেশের সম্মাননা

২০২০ সালের ২৩ মার্চ তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তবে তাঁর চিন্তা, লেখা ও প্রজ্ঞা আজও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রেরণার উৎস হিসেবে উজ্জ্বল। আমরা শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি এই বহুমাত্রিক মনীষীকে।