তেহরানের ভালিআসর স্কয়ারে ‘আমার পছন্দ, আমার দেশ’—এই স্লোগান উজ্জ্বল আলোয় আলোড়িত করছিল কেন্দ্রস্থল। বিশাল একটি বিলবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইরানের জাতীয় নারী ফুটবল দলের সদস্যরা, তাদের পাশে সরকারি কর্মকর্তারা। পতাকা হাতে থাকা হাজারো মানুষের উল্লাসের মধ্য দিয়ে দলের প্রতি বীরোচিত সংবর্ধনা জানানো হয়। অনুষ্ঠানটি ইরানের জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।
ইরানের নারী দল, যাদের ‘লায়নেস’ বলা হয়, সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত নারী এশিয়ান কাপে তিন ম্যাচে পরাজিত হয়। তবে তাদের দেশে ফেরার সংবর্ধনা ছিল এক বড় জয়। মাত্র কয়েক দিন আগে দলের অধিনায়ক ও পাঁচ খেলোয়াড় ব্রিসবেনে একটি সেফ হাউসে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজনই সেখানে থেকে যান।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ ঘোষণা করেন, “এই অ্যাথলেটরা তাদের মাতৃভূমি, পতাকা এবং নেতার প্রতি অনুগত।” জার্সি ও বাধ্যতামূলক কালো হিজাব পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন নারীরা। যদিও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, খেলোয়াড়দের মুখে ছিল বিষণ্ণতার ছাপ।
তাদের এই যাত্রা শুধু ফুটবল নয়; এটি রাজনৈতিক চাপে ভরা এক দুঃসাহসিক অভিযান। জাতীয় দলের সদস্যদের বয়স মাত্র ২১ বছর, এবং তাদের সামনে দুই পথ: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও দমনকারী শাসকগোষ্ঠীর মুখোমুখি থাকা, অথবা রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া—যা স্বাধীনতা দিতেও পরিবারকে ঝুঁকির মুখে ফেলত। সাবেক ফুটবলারের ভাষায়, “তাদের যদি পরিবারের নিরাপত্তা দুর্বল হয়, সেটিকেই তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।”
ইরান নারী ফুটবল দলের অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ফিফা নারী দর্শক ও জাতীয় নারী দল উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়ম অমান্য করা যায় না।
নারী এশিয়ান কাপ ২০২৬: ইরানের ম্যাচের সারসংক্ষেপ
| তারিখ | প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ | ফলাফল | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ২ মার্চ ২০২৬ | দক্ষিণ কোরিয়া | হারা | জাতীয় সংগীতের সময় খেলোয়াড়েরা অংশ নেননি |
| ৫ মার্চ ২০২৬ | চীন | হারা | সামরিক অভিবাদন প্রদর্শন |
| ৮ মার্চ ২০২৬ | অস্ট্রেলিয়া | হারা | জাতীয় সংগীত বাজলেও গাইনি, নিরাপত্তা প্রহরা |
অস্ট্রেলিয়ায় দলের অবস্থান এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টাকে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। খেলোয়াড়দের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যদিও ইরান সরকার তা ‘অপহরণ’ দাবি করে। দলের অর্ধেক সদস্য কুয়ালালামপুরে অবস্থান নেন, বাকি দুজন—৩৪ বছর বয়সী আতেফে রামাজানজাদেহ ও ২১ বছর বয়সী ফাতেমেহ পাসানদিদেহ—অস্ট্রেলিয়াতেই থাকেন।
তাদের যাত্রা দেখায়, ক্রীড়ার মাঠ কেবল জয় বা পরাজয়ের স্থান নয়; এটি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতীক। ইরানের নারী ফুটবল দল তাদের সাহস, প্রতিজ্ঞা ও সংকল্পের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে, বালাই-বিপদের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
যদিও সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, খেলোয়াড়দের উপর সরকারের দমন নীতি এবং ভবিষ্যৎ শাস্তি সম্পর্কে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। এই নারী ফুটবল দল প্রমাণ করেছে যে সাহস ও সংকল্প শুধু খেলার জন্য নয়, বরং মানবাধিকারের জন্যও অপরিহার্য।
মোটকথা, ইরানের নারী ফুটবল দলের এই যাত্রা একদিকে খেলাধুলার অর্জন, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে দুঃসাহসিক অভিযানের প্রতীক।
