ইরানকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চলমান যুদ্ধে আরও তীব্র পদক্ষেপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখনো সচল করা সম্ভব হয়নি, ফলে তেল ও গ্যাসের দাম উর্ধ্বমুখী। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা ও নাগরিকরা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে ঢুকতে হতে, দুই দেশই ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হত্যায় আরও মরিয়া।
গত কয়েক রাতের মধ্যে পরপর হামলায় ইরানের অন্তত তিনজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ বুধবার ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। পরে তেহরানও এ হত্যাকাণ্ডের তথ্য নিশ্চিত করেছে। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে হামলা জোরদার করেছে।
ইরানের হামলায় গতকালই ইসরায়েলে দুই নাগরিক নিহত হয়েছেন। বেনগুরিয়ন বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনটি বেসামরিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রামাত গান এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করেছেন ইসরায়েলি সেনারা।
উপসাগরীয় দেশগুলিতেও ইরানের হামলা অব্যাহত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। কূটনীতিকপাড়া লক্ষ্য করে ছোড়া একাধিক ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে, কুয়েত ও কাতারও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দূতাবাসে একের পর এক হামলার কারণে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর সমস্ত দূতাবাসে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনঃমূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার পর দেশটির যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সেক্রেটারি আলী লারিজানি। তাঁর হত্যা পরমাণু কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দেশকে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের শূন্যে ফেলে দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, শীর্ষ নেতাদের হত্যার কারণে ইরান দুর্বল হবে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো ব্যক্তিগত কারণে প্রভাবিত হয় না।
ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ যৌথভাবে ইসরায়েলে ৩৪টি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রামাত গানের একটি বাড়িতে আঘাত হানায় এক দম্পতি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১৯২ জন। ইসরায়েলও তেহরানের সাউথ পার্স প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও হামলার তথ্য সংক্ষেপে দেখানো হলো:
| তারিখ | নিহত ব্যক্তি/স্থান | দায়ী পক্ষ | বিবরণ |
|---|---|---|---|
| ২৮ ফেব্রুয়ারি | আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সহ ৪৮ জন | যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল | ইরানের শীর্ষস্থানীয় বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা |
| ১৬ মার্চ | আলী লারিজানি, গোলামরেজা সোলাইমানি | ইসরায়েল | জাতীয় নিরাপত্তা ও বাসিজ বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার হত্যাকাণ্ড |
| ১৮ মার্চ | ইসমাইল খতিব | ইসরায়েল | গোয়েন্দামন্ত্রী হত্যা, ইরানের প্রতিক্রিয়া রকেট হামলা |
| ১৮ মার্চ | রামাত গান, ইসরায়েল | ইরান | ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, ২ মৃত্যু |
| ১৮ মার্চ | বৈরুতে ১৫ তলা ভবন | ইসরায়েল | ধ্বংসযজ্ঞ, ১০ নিহত, ২৭ আহত |
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকায় তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দেশটির মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা পাচ্ছেন না। যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ন্যাটোর প্রকৃত কার্যকারিতা প্রতিরক্ষা কেন্দ্রিক, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় যুদ্ধ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছে এবং যুদ্ধ শেষ করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে। দেশটির অভ্যন্তরে ও বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে।
