অপহরণ-ধর্ষণ মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরে এক কলেজছাত্রীকে অপহরণ করে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সোহেল শেখ নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় এক দশকের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এই রায়কে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

রবিবার (১৫ মার্চ) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত সূত্র জানায়, মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পর্যালোচনা করে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই দণ্ডাদেশ দেন।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত সোহেল শেখ ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার চর নারান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মো. ইকবাল শেখের ছেলে। আদালতের রায়ে বলা হয়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে।

মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ছাত্রী তখন বোয়ালমারী মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে তিনি প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে আলফাডাঙ্গায় নিজ বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে সোহেল শেখ তাকে জোরপূর্বক একটি প্রাইভেট কারে তুলে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর মেয়েটির বাবা নজরুল ইসলাম অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়েকে ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, অপহরণের পর ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয় এবং তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি তাকে বিদেশে পাচারেরও চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

অবশেষে বাধ্য হয়ে ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বোয়ালমারী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর বাবা। এরপর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে গড়ায়। মামলার শুনানিকালে একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দি, মেডিকেল রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এই মামলার রায় প্রদান করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম রব্বানী রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় আনা অভিযোগসমূহ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেছেন।

তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ সমাজের জন্য অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং উদ্বেগজনক। আদালতের এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
ঘটনার তারিখ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬
মামলা দায়ের২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬
ঘটনার স্থানআলফাডাঙ্গা উপজেলা, ফরিদপুর
ভুক্তভোগীবোয়ালমারী মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী
আসামিসোহেল শেখ
আদালতফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল
রায়ের তারিখ১৫ মার্চ
দণ্ডযাবজ্জীবন কারাদণ্ড
অতিরিক্ত শাস্তি১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১ বছর কারাদণ্ড

আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই রায় সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর বার্তা দেবে এবং ভবিষ্যতে অপরাধীদের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে।