রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি বা অস্থায়ী ছাড় (ওয়েভার) চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ভারতের মতো বাংলাদেশকেও একই ধরনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর শেরেবাংলানগরে পরিকল্পনা মন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান তিনি। বৈঠকে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি, বাণিজ্য সহযোগিতা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রী জানান, রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ভারতের জন্য একটি অস্থায়ী ছাড় দিয়েছে। বাংলাদেশও একই ধরনের সুবিধা পাওয়ার আশা করছে। তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি—বাংলাদেশকেও যদি একই ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হবে। বিষয়টি তারা ওয়াশিংটনে পাঠাবে বলে জানিয়েছে। এখন দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত আসে।”
Table of Contents
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস খুঁজতে আগ্রহী। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক দেশই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতের বড় অংশই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা সরাসরি অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করে। তাই তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ পেলে তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক হতে পারে।
বৈঠকে আলোচিত অন্যান্য বিষয়
বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এ বৈঠকে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, “বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের বিষয়। এখনই এ নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশের স্বার্থে বিষয়টি কীভাবে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই আমরা বিবেচনা করছি।”
আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব
বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের করণীয় কী—এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সরকার পরিকল্পনা করছে। যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি বা দীর্ঘস্থায়ী—প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বৈঠকেও এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির চিত্র
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির কাঠামো বোঝাতে নিচের সারণিটি গুরুত্বপূর্ণ:
| জ্বালানি উৎস | বাংলাদেশের নির্ভরতার ধরন | প্রধান সরবরাহকারী অঞ্চল |
|---|---|---|
| অপরিশোধিত তেল | অধিকাংশই আমদানি নির্ভর | মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়ার কিছু দেশ |
| পরিশোধিত জ্বালানি তেল | বিদ্যুৎ ও পরিবহনে ব্যাপক ব্যবহার | সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য |
| এলএনজি | বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পে ব্যবহৃত | কাতার, ওমান, স্পট মার্কেট |
| কয়লা | বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় ব্যবহৃত | ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া |
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল আমদানির সুযোগ পায়, তবে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্ভাব্য ওয়েভার পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
