নিজের প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীকে ভুয়া ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানসহ মোট ৩৬ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান অভিযোগ গঠন করে এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, শুনানি শেষে বিচারক মামলার সব আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। এর মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। আগামী ৪ এপ্রিল মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে আদালতে দায়িত্ব পালনকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মোকাররম হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার প্রধান আসামি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে পলাতক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক গত ৪ জানুয়ারি আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্তে জানা যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী তাঁর মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের প্রটোকল কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরীকে মালিক হিসেবে দেখিয়ে ‘ভিশন ট্রেডিং’ নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এরপর বিভিন্ন জাল নথিপত্র ব্যবহার করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের পোর্ট শাখা থেকে ২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করানো হয়।
দুদকের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ১৭টি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো উপেক্ষা করেই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন রুখমিলা জামান এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরী কার্যত ‘ডি ফ্যাক্টো’ চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংকের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন। তিনি বোর্ড সভায় উপস্থিত থেকে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের অর্থের ব্যবহার সম্পর্কেও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। মোট ২৫ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট ও আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়ামের আগের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়। অবশিষ্ট ৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যাংকের জুবিলি রোড শাখা থেকে নগদ উত্তোলন করা হয়।
নিচের সারণিতে ঋণের অর্থের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—
| খাত | অর্থের পরিমাণ |
|---|---|
| আরামিট সিমেন্ট ও আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়ামের দায় পরিশোধ | ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা |
| নগদ উত্তোলন | ৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা |
| মোট ঋণ | ২৫ কোটি টাকা |
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডি ও হাওলা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে পাচার করা হয়। পরে সেখান থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে সম্পদ কেনা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্ত চলাকালে রুখমিলা জামানের গাড়িচালক ইলিয়াসের এক প্রতিবেশীর বাসা থেকে ২৩ বস্তা নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। এসব নথিপত্রে বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেনার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমান জানান, উদ্ধার হওয়া নথিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এক হাজার একশোর বেশি ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্তত নয়টি দেশে সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, দুবাইয়ে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১০টি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতেও তাঁর সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর আদালত সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবে দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নিষেধাজ্ঞার পরও তাঁরা দেশ ত্যাগ করে বিদেশে চলে যান।
এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বহুল আলোচিত অর্থ পাচার ও ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আগামী সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে মামলার বিভিন্ন তথ্য ও সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপিত হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
