ছোট ফেনী নদী এক সময় ছিল উজান থেকে মিষ্টি পানি নিয়ে চরাঞ্চলের কৃষকের জীবনের প্রাণশক্তি। নদীর পানি দিয়েই ধান, শীতকালীন সবজি ও বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন হাজার হাজার কৃষক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবং মুসাপুর ক্লোজারের ক্ষয় হওয়ার কারণে সাগরের লবণাক্ত পানি নদীতে প্রবেশ করে যাচ্ছে। এর ফলে নদীর পানি সরাসরি কৃষিতে ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা ফসলের উৎপাদন ও কৃষকের আয় উভয়কেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নদীর পানি ও কৃষি প্রভাব
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, চারা থেকে ফসল পর্যন্ত সব পর্যায়ে লবণাক্ত পানি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে। ধান চারা দু’দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে, সবজি লাল হয়ে ঝড়ে পড়ছে, আর জমি ধীরে ধীরে উর্বরতা হারাচ্ছে। ফেনী সদর ও সোনাগাজী, বালিগাঁও, দাগনভুঞা উপজেলার কৃষকরা সবজি ও ধানের চাষ করতে পারছেন না, ফলে তারা ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবস্থা (নলকূপ, পাইপ সেচ) ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
নিচের টেবিলে উপজেলা অনুযায়ী প্রভাবিত ফসল, লবণাক্ততার প্রভাব এবং বর্তমান সমস্যার সারসংক্ষেপ দেখানো হলো:
| উপজেলা | প্রভাবিত ফসল | লবণাক্ততার প্রভাব | বর্তমান সমস্যা |
|---|---|---|---|
| সোনাগাজী | বোরো ধান, আমন | চারা পুড়ে মারা যায় | চাষের ব্যয় বৃদ্ধি, ফসল কম পাওয়া |
| বালিগাঁও | শীতকালীন সবজি, তরমুজ, শসা, মরিচ | গাছ লাল হয়ে মারা যাচ্ছে | জমি অনাবাদি, খরচ বৃদ্ধি |
| দাগনভুঞা | সবজি ও ধান | লবণাক্ত পানি সেচে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত | বিকল্প নলকূপ ব্যয়বহুল, ঘাস কম |
কৃষকের কণ্ঠ
সোনাগাজীর কৃষক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, “আগে নদীর পানি দিয়ে ধান চাষ করতাম। এখন একবার পানি লাগালেই চারা পুড়ে মারা যায়। আমাদের বাঁচার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”
ফেনী সদর উপজেলার শেখ ফরিদ আমিন যোগ করেন, “বিএডিসির সেচ পাম্প ব্যবহার করে আমরা কম খরচে ফসল উৎপাদন করতাম। কিন্তু এখন নোনা পানি ও বালি জমির কারণে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
নূর হোসেন বলেন, “নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের কয়েক লাখ মানুষ। লবণাক্ততার কারণে শত শত একর জমি অনাবাদি, গবাদি পশুর খাবারের সংকট তৈরি হয়েছে।”
সমাধানের প্রস্তাবনা
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। মূল প্রস্তাবনাগুলো হলো:
মুসাপুর ক্লোজার দ্রুত পুনঃনির্মাণ।
স্লুইস গেট আধুনিকায়ন ও সময়মতো পরিচালনা।
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং।
লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান ও ফসলের বীজ সরবরাহ।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর ও খাল পুনঃখনন।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, “মুসাপুর ক্লোজার নির্মাণ হলে নদীভাঙন ও জোয়ার-ভাটার কারণে সৃষ্ট সমস্যা দূর হবে এবং চরাঞ্চলের কৃষক উপকৃত হবেন।”
উপকূলীয় এ অঞ্চলের কৃষি এখন পুরোপুরি ছোট ফেনী নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, ভবিষ্যতে এই অঞ্চল মরুভূমি বা অনাবাদি জমিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি ও কৃষকের জীবন বিপন্ন হওয়ার আগে তৎপর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
এই প্রতিবেদন স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকের জীবন রক্ষার জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত।
