দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে দিয়ে আবারও ৯ শতাংশের ঘর ছাড়িয়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। দীর্ঘ ৯ মাস পর মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৫ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা দীর্ঘ সময় পর আবারও দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
Table of Contents
মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি ও বর্তমান চিত্র
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, পণ্য ও সেবার মূল্য সূচক জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত বছরের এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। সেই হিসেবে গত ১০ মাসের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসেই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করেছে দেশ। মূলত বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামই এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী।
গত দুই মাসের মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক চিত্র
| খাত বা সূচক | জানুয়ারি ২০২৬ (হার %) | ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (হার %) | বৃদ্ধির হার (%) |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি | ৮.৫৮ | ৯.১৩ | ০.৫৫ |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | ৮.২৯ | ৯.৩০ | ১.০১ |
| খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি | ৮.৮১ | ৯.০১ | ০.২০ |
খাদ্য খাতের অস্থিরতা ও সাধারণের ভোগান্তি
ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের চড়া দাম। জানুয়ারিতে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে তা এক লাফে বেড়ে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশই এখন কেবল খাবার কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে শাকসবজির বাজারেও গত মাসে অস্বস্তি বজায় ছিল। বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলোর কারসাজি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিই মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
খাদ্য-বহির্ভূত খাতেও অস্বস্তি
কেবল চাল-ডাল নয়, বরং জীবনযাত্রার অন্যান্য অনুসঙ্গও এখন বেশ ব্যয়বহুল। বিবিএস জানাচ্ছে, খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও জানুয়ারির ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ থেকে বেড়ে ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ০১ শতাংশে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো ঘরভাড়া বা আবাসন ব্যয়, যাতায়াত বা পরিবহন খরচ, পোশাক-আশাক এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিতেও এখন মানুষকে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান দাম এই খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিকে তরান্বিত করছে।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যেখানে ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সরকারের এই নীতি এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। গত ১২ মাসের গড় হিসাবে জানুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের উপরে ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রমজান মাসকে সামনে রেখে যদি বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার না করা হয় এবং সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা না যায়, তবে সামনের মাসগুলোতে এই হার ১০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।
