ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. আবদুস সালাম ব্যাপারীকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। আজ রবিবার (৮ মার্চ) স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তাকে অপসারণের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তুতকৃত পদত্যাগপত্রে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা সংস্থাটিকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ
প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। গত বছরের ১১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে কোনো প্রকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই তড়িঘড়ি করে তাকে এই প্রভাবশালী পদে বসানো হয়েছিল। যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনৈতিক আঁতাতই এই নিয়োগের প্রধান ভিত্তি ছিল বলে ওয়াসার ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা তৈরি হয়।
অপসারিত এমডির আমলনামা ও অভিযোগের সংক্ষিপ্তসার
| বিষয়ের ধরণ | অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ | আর্থিক সংশ্লেষ/পরিমাণ |
| নিয়োগ বিতর্ক | নিয়ম বহির্ভূতভাবে তড়িঘড়ি করে এমডি পদে আসীন হওয়া। | নিয়োগকালীন প্রশাসনিক অনিয়ম |
| প্রকল্প ভিত্তিক অনিয়ম | ওয়াসার তিনটি মেগা প্রকল্পের কেনাকাটা ও নির্মাণে অনিয়ম। | প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা |
| বিভাগীয় মামলা | দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিপূর্বে দায়েরকৃত মামলা। | একাধিক প্রশাসনিক তদন্ত |
| পদক্ষেপ | ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর ও অপসারণ। | তাৎক্ষণিক কার্যকর |
মেগা প্রকল্প ও পাঁচ হাজার কোটি টাকার লুটপাট
প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারী বিগত বছরগুলোতে ঢাকা ওয়াসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মেগা প্রকল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। প্রকল্পগুলোতে কেনাকাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিটি ধাপে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পগুলোতে বিশাল অংকের অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। তবে অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে তিনি সেই মামলাগুলো ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে এমডি পদের মতো সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন।
অপসারণের নেপথ্য কারণ ও জনপ্রতিক্রিয়া
ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই এই নিয়োগের প্রতিবাদ জানানো হচ্ছিল। বিশেষ করে রাজধানীবাসী যখন গ্রীষ্মের শুরুতেই তীব্র পানি সংকটের কবলে পড়ার আশঙ্কা করছে, তখন এমন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নেতৃত্বে রাখা সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, ওয়াসার কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় এই অপসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীর অপসারণের মাধ্যমে সংস্থাটির সংস্কার প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওয়াসার ইতিহাসে এমন বিতর্কিত নিয়োগ এবং অপসারণের ঘটনা জনমনে আস্থার সংকট দূর করতে কতটা সহায়ক হবে, তা এখন দেখার বিষয়। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর সচেতন মহলের।
