আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর প্রসিকিউশন বিভাগ ও তদন্ত সংস্থায় শিগগিরই বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে নতুন সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাঠামো, বিশেষ করে প্রসিকিউশন ও তদন্ত কার্যক্রমকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের দুটি বেঞ্চে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ২১টি মামলার বিচার চলছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে এসব মামলার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনার লক্ষ্য নিয়ে একাধিক প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি মাসের মধ্যেই ট্রাইব্যুনালের কয়েকজন বিতর্কিত প্রসিকিউটর পদত্যাগ করতে পারেন অথবা তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করতে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘোষিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রায়—যার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও রয়েছে—সেগুলোর মামলা ও রায়ের নথিপত্র পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, এসব মামলার তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি, অসঙ্গতি বা আইনি ত্রুটি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে চিফ প্রসিকিউটরের এই ধরনের পর্যালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাঁর মতে, মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে আপিল যথাযথভাবে দাখিল হয়েছে কি না এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি দুর্বলতা রয়েছে কি না।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চলমান ২১টি মামলার অনেকগুলোর আসামি নির্ধারণ করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মৌখিক নির্দেশে। অভিযোগ রয়েছে, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষে বসেই এসব মামলার সম্ভাব্য আসামিদের তালিকা তৈরি করা হতো। নতুন প্রসিকিউশন এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে চায় এবং প্রয়োজন হলে পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কিত চারটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিধান এবং সেনাসদস্যদের বিচারের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব অধ্যাদেশের আইনি বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও পর্যালোচনা করা হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আইসিটির মামলাগুলোর পরিসংখ্যান নিম্নরূপ—
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| চলমান মামলা | ২১ |
| মোট আসামি | ৪৫৭ |
| পলাতক আসামি | ২৮৩ |
| কারাগারে থাকা আসামি | ১৬৪ |
| তদন্তাধীন নতুন মামলা | ৩৪ |
আইসিটির ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন প্রণয়ন করে। তবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইনটি সংশোধন করে এবং ২০১০ সালে প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০১২ সালে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই ট্রাইব্যুনালে মোট ৬৬টি মামলার রায় দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইসিটির কার্যক্রম নতুনভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় প্রসিকিউশন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন ঘটে এবং ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম নতুন মাত্রা পায়।
বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালকে একটি সুসংগঠিত ও নিরপেক্ষ বিচার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হবে। তাঁর মতে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং বিচার—এই তিনটি স্তরেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেনও আশা প্রকাশ করেছেন, প্রসিকিউশনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রাইব্যুনাল প্রকৃত অর্থেই ন্যায়বিচারের পথে এগোতে পারবে।
