বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে গত কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতা যেন থামছেই না। একদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক সূচি ও ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করে খেলা মাঠে রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ঘরোয়া ক্লাব ক্রিকেটে দানা বেঁধেছে গভীর সংকট। ছেলেদের ঘরোয়া লিগের পর এবার দেশের নারী প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন নিয়েও চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে সৃষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা এবং ক্লাবগুলোর অনড় অবস্থান নারী ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
Table of Contents
সংকটের মূলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি
সম্প্রতি বিসিবি নারী প্রিমিয়ার লিগের ৯টি ক্লাবকে নিয়ে একটি সভা আহ্বান করে, যেখানে মাত্র ৬টি ক্লাব অংশ নেয়। সভায় বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী জুনে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক ব্যস্ততার কারণে জাতীয় দলের শীর্ষ তারকা ক্রিকেটাররা এবারের প্রিমিয়ার লিগে অংশ নিতে পারবেন না। বিসিবির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী লিমিটেডসহ মোট তিনটি বড় দল। তাদের মতে, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ছাড়া লিগ আয়োজন করলে প্রতিযোগিতার মান ও আকর্ষণ বজায় রাখা সম্ভব নয়।
আবাহনী লিমিটেডের ক্রিকেট সেক্রেটারি হাসান তামিম এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নারী ক্রিকেটের পরিধি এমনিতেই ছোট, তার ওপর তারকা খেলোয়াড়রা না থাকলে টুর্নামেন্টটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেবে। অন্যদিকে, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রুমানা আহমেদ এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শত শত নারী ক্রিকেটার সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেন শুধুমাত্র এই লিগের আশায়। বিসিবি কেবল গুটিকয়েক জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে ব্যস্ত থাকলে তৃণমূলের ক্রিকেটাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ঝরে পড়বেন।
ক্লাব ক্রিকেটের বর্তমান চিত্র ও অংশগ্রহণ পরিস্থিতি
বিসিবির বর্তমান পর্ষদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আইনি জটিলতায় ৪৫টি ক্লাব বয়কট কর্মসূচি পালন করছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ লিগের ওপর। নিচে বর্তমানে ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| লিগের নাম | মোট ক্লাব সংখ্যা | অংশগ্রহণকারী ক্লাব | বর্তমান অবস্থা |
| প্রথম বিভাগ লিগ | ২০টি | ১২টি | আংশিক সূচি সম্পন্ন |
| দ্বিতীয় বিভাগ লিগ | ২৪টি | ১২টি | বড় অংশ বয়কটের মুখে |
| নারী প্রিমিয়ার লিগ | ০৯টি | ০৬টি (প্রাথমিক সম্মত) | অনিশ্চিত (৩টি ক্লাব অনড়) |
| ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) | ১২টি | – | শুরু হওয়া নিয়ে সংশয় |
ডব্লিউবিপিএল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি সংকট
এপ্রিলের শুরুতে প্রথমবারের মতো নারী ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ‘ডব্লিউবিপিএল’ আয়োজনের ঘোষণা দিলেও সেখানেও বিপত্তি দেখা দিয়েছে। বিসিবি এখনো তিনটি দলের জন্য চূড়ান্ত ফ্র্যাঞ্চাইজি নিশ্চিত করতে পারেনি। যদিও রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের মালিকানাধীন নাবিল গ্রুপ এবং চট্টগ্রামের কন্টিনেন্টাল গ্রুপ আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে তৃতীয় দলের জন্য এখনো কোনো শক্তিশালী বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি। এই লক্ষ্যে আগ্রহ প্রকাশের সময়সীমা ৪ মার্চ থেকে বাড়িয়ে ৮ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিণতি
যদি শেষ পর্যন্ত নারী প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করা সম্ভব না হয়, তবে তা বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের অগ্রযাত্রাকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে উদীয়মান নারী ক্রিকেটাররা বিমুখ হতে পারেন। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, বিসিবি ও ক্লাবগুলোর মধ্যকার এই দূরত্ব ঘোচাতে দ্রুত একটি মধ্যস্থতা প্রয়োজন, অন্যথায় মাঠের খেলা হারের চেয়ে টেবিলের খেলায় দেশের ক্রিকেটের বেশি ক্ষতি হবে।
