কাজী সালমা সুলতানা
৫ মার্চ ১৯৭১ তারিখটি বাংলার ইতিহাসে একটি অম্লান অধ্যায় হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ, মিছিল ও হরতালের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান এবং স্বাধীনতার ইশতেহার বেতারে প্রচারের পর রাওয়ালপিন্ডির শাসকগোষ্ঠী প্রথমবারের মতো নড়েচড়ে বসে।
এই দিনে রাজপথে মুক্তিকামী বাঙালিরা স্লোগান দিয়ে প্রকম্পিত করে তোলে শহর। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’—এই ধরনের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি রাস্তাঘাট।
তবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকেনি। ৫ মার্চ চট্টগ্রামে সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে ২২২ জন এবং টঙ্গী শিল্প এলাকায় চার শ্রমিক শহীদ হন, আহত হন ২৫ শ্রমিক। ঢাকায় এই খবরে জনসাধারণের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে ৩২৫ কয়েদি শহিদ মিনারে পৌঁছান, স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে। কারাগারের ফটক ভাঙার সময় প্রহরীর গুলিতে সাত কয়েদি প্রাণ হারান। সন্ধ্যায় সরকারি সূত্রে ঘোষণা করা হয় যে ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মাওলানা গোলাম গাউস হাজারী জানান, পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত সদস্যদের পক্ষ থেকে ভুট্টোর কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। মানিক গোলাম জিলানী বলেন, “সংখ্যাগুরু দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া বিকল্প নেই।” তবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এসব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি।
এদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ব্যাংক খোলা থাকে এবং শহিদদের আত্মার শান্তির জন্য মসজিদে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর ও সিলেটে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। লাহোরেও শহীদদের স্মরণে গায়বানা জানাজা এবং দেশের সংহতির জন্য বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাত হয়।
পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২০ হাজার বাঙালির লাশ হলে আন্দোলন থামাতে প্রস্তুতি নিত। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান বিকেলে ঢাকায় পৌঁছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
রাতে বঙ্গবন্ধু বিদেশি বেতারে প্রচারিত সংবাদকে ‘অসদুদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘কল্পনার ফানুস’ আখ্যায়িত করেন। বিকালে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ছাত্রলীগ ও ডাকসুর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বের হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী (৫ মার্চ ১৯৭১)
| স্থান | ঘটনা | নিহত | আহত |
|---|---|---|---|
| চট্টগ্রাম | সশস্ত্র বাহিনীর গুলি | 222 | – |
| টঙ্গী শিল্প এলাকা | শ্রমিকদের উপর গুলি | 4 | 25 |
| ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার | কয়েদিদের মুক্তি প্রক্রিয়া | 7 | – |
| শহিদ মিনার | শহীদদের স্মরণে মিছিল | – | – |
এই দিনটি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণমানুষের অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বাধীনতার তাগিদকে ইতিহাসে স্থায়ী করেছে। জাতির বিভিন্ন শ্রেণি—ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, সাহিত্যিক—সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল মুক্তিকামী বাংলার এক অভূতপূর্ব উত্থান, যা পরবর্তী স্বাধীনতার পথে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা রাখে।
