খুলনা মহানগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা ডাকবাংলা মোড় বুধবার (৪ মার্চ) রাতে এক ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হলো। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে মেয়ের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে এসে ঘাতকদের নির্মম বুলেটে ও চাপাতির আঘাতে প্রাণ হারালেন রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং বিএনপি নেতা মীনা মাসুম বিল্লাহ। আনন্দময় ঈদ কেনাকাটা মুহূর্তেই রূপ নিল এক বীভৎস শোকগাথায়।
Table of Contents
ঘটনার বিবরণ: এক আতঙ্কের রাত
রাত তখন আনুমানিক ৯টা। উৎসবের আমেজে ডাকবাংলা মোড় এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য। সপরিবারে কেনাকাটা করতে মাসুম বিল্লাহ ঢুকেছিলেন বিখ্যাত জুতার ব্র্যান্ড ‘বাটা’-র শোরুমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সাতজনের একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল হঠাৎ শোরুমের ভেতরে প্রবেশ করে তাকে লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাসুম বিল্লাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তার পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
এই নৃশংসতা চলাকালীন নিহতের নাবালিকা মেয়ে ও পরিবারের সদস্যরা আর্তচিৎকার করতে থাকেন। চোখের সামনে বাবাকে এভাবে খুন হতে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় তারা। গুলির শব্দ এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে শোরুমসহ পুরো ডাকবাংলা এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং কেনাকাটা করতে আসা মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে।
নিহতের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও দলীয় পরিচয়
| বিষয় | তথ্য |
| নাম | মীনা মাসুম বিল্লাহ |
| আবাসস্থল | বাগমারা এলাকা, রূপসা উপজেলা, খুলনা। |
| পদবি | সাবেক সভাপতি, রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। |
| রাজনৈতিক পরিচয় | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সক্রিয় কর্মী। |
| পারিবারিক পরিচয় | সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও চাঞ্চল্যকর নেতা মীনা কামাল ওরফে ‘ফাটাকেষ্টোর’ ভাই। |
ঘাতক আটক ও জনরোষের পরিস্থিতি
হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাহসী জনতা ধাওয়া করে একজনকে ধরে ফেলে। আটককৃত ব্যক্তির নাম অশোক ঘোষ। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতা ঘাতককে নিজের হাতে বিচার করার জন্য ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পাশাপাশি সেনাসদস্যদের ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। পরে সেনাবাহিনী রাস্তা ফাঁকা করে আটক অশোক ঘোষকে নিরাপদ পুলিশি হেফাজতে নিয়ে যায়।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাসুম বিল্লাহকে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, এটি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা রাজনৈতিক কোনো পূর্বশত্রুতার জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আটককৃত ঘাতককে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকি ৬ জন পলাতক সন্ত্রাসীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বর্তমানে খুলনার ডাকবাংলা মোড় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঈদের খুশির বদলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর থেকে রূপসা ও মহানগর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি।
