ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূলের হামলার পর ধারণা করা হয়েছিল, তেহরানের শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু যুদ্ধের পঞ্চম দিনে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রাথমিক ‘শক অ্যান্ড অউ’ (আকস্মিক ও প্রচণ্ড আঘাত) কৌশল আশানুরূপ ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এক দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমুখী সংঘাতের ফাঁদ পেতেছে, যেখানে যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। পেন্টাগন এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, এই সংঘাত স্বল্পস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং এতে ‘অতিরিক্ত প্রাণহানির’ আশঙ্কা রয়েছে।
Table of Contents
ইরানের রণকৌশল: ‘কস্ট-ইমপোজিশন’ বা যুদ্ধব্যয় বৃদ্ধি
ইরান সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত বাহিনীকে হারানো অসম্ভব। তাই তারা ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’ বা যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে তারা সরাসরি যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তেহরান এখন ইসরায়েলের আকাশসীমা ভেদ করার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর নিখুঁত আঘাত হানার ওপর। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় জরুরি সহায়তা চেয়েছে।
সংঘাতের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও কৌশলগত পরিবর্তন
| বিষয় | প্রাথমিক ধারণা (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) | বর্তমান বাস্তবতা (মাঠের চিত্র) |
| শাসনব্যবস্থা | দ্রুত পতন ও গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে। | খামেনির মৃত্যুর পরও শাসনব্যবস্থা স্থিতিশীল। |
| যুদ্ধের মেয়াদ | কয়েক দিনের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’। | দীর্ঘমেয়াদী ও অন্তহীন যুদ্ধের শঙ্কা। |
| আঞ্চলিক প্রভাব | মিত্রদের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। | মিত্রদেশগুলো (আমিরাত, কাতার) হামলার শিকার ও শঙ্কিত। |
| অর্থনৈতিক প্রভাব | সীমিত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। | জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী; সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত। |
জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে অস্থিরতা
ইরানের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্ববাজারে মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এই রুটে সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দেওয়ায় বিমা কোম্পানিগুলো বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের প্রধান তেল শোধনাগার এবং কাতারের এলএনজি কেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। তেহরানের লক্ষ্য স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক আঘাতের চেয়েও বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা, যাতে ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য হয়।
অভ্যন্তরীণ ফাটল ও কুর্দি কার্ড
মাঠের যুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ভেতরে ‘গৃহযুদ্ধ’ বা ‘অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা’ তৈরির বিকল্প পথে হাঁটছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুর্দি নেতাদের সঙ্গে টেলিফোন আলাপ এবং সিআইএ-র মাধ্যমে কুর্দি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করার পরিকল্পনা মূলত এই কৌশলেরই অংশ। তবে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরাক সীমান্তের কুর্দি ক্যাম্পগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি মহলে আলোচিত ‘অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের’ স্বপ্ন এখন পর্যন্ত তেহরানের কড়া নজরদারিতে ধূলিসাৎ বলেই মনে হচ্ছে।
উপসংহার: সহ্যক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা
বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, এই যুদ্ধ কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। এটি এখন একটি ‘সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা’ (War of Attrition)। ইরান কয়েক মাস ধরে এই মাত্রার প্রতিরোধ বজায় রাখার সক্ষমতা রাখে বলে দাবি করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো—এই আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তাদের বৈশ্বিক কৌশলে (বিশেষ করে চীনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি) কতটা প্রভাব ফেলবে। ইরান সংকট এখন কেবল একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্যের টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা।
