মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক নতুন ও জটিল সমীকরণ দেখা দিয়েছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার চলমান সংঘাত এখন আর কেবল আকাশপথের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে এসে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ভেতরে সরাসরি স্থল অভিযানের পরিবর্তে এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ওয়াশিংটন এখন ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং শাসকগোষ্ঠীকে নাস্তানাবুদ করার ছক কষছে।
Table of Contents
সিআইএ-র রণকৌশল ও কুর্দি সংযোগ
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) ইতোমধ্যে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিদ্রোহী কুর্দি সংগঠনগুলোর হাতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে বিদ্রোহী কুর্দি নেতাদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধাকে সশস্ত্র করে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো। এটি মূলত একটি ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা।
কুর্দি গোষ্ঠী ও মার্কিন সহায়তার সম্ভাব্য রূপরেখা
| বিষয় | বিবরণ ও কৌশল |
| প্রধান নিয়ামক | কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক দল (KDPI) এবং অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী। |
| অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ | মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র মাধ্যমে সরাসরি জোগান। |
| ঘাঁটি ও অবস্থান | ইরাকের ইরবিল এবং ইরান-ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চল। |
| মূল লক্ষ্য | ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ গণ-অভ্যুত্থান উসকে দেওয়া। |
| মার্কিন সমর্থন | পেন্টাগনের গোয়েন্দা তথ্য এবং ড্রোন নজরদারি সহায়তা। |
ট্রাম্পের কূটনৈতিক তৎপরতা ও কুর্দি নেতাদের ভূমিকা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে কৌশলগত এই চালের অংশ হিসেবে ইরানি কুর্দিদের প্রভাবশালী নেতা মুস্তফা হিজরির সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। হোয়াইট হাউস সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন পদাতিক সৈন্য পাঠানোর রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে কুর্দি যোদ্ধাদের ‘স্থল শক্তি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কুর্দি নেতারাও এই সুযোগে ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া। তারা ইতোমধ্যে ইরানি সেনাদের প্রতি সরকারের পক্ষ ত্যাগ করার এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর প্রভাব পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। বিশেষ করে তুরস্ক এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে তাদের সীমান্তের কাছে কুর্দি সশস্ত্র তৎপরতা দমনে কাজ করছে। ওয়াশিংটন যদি কুর্দিদের অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করে, তবে তা তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে, ইরানের কুর্দিদের এই অভ্যুত্থান দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও উৎসাহিত করতে পারে, যা প্রতিবেশী পাকিস্তানের অশান্ত বালুচিস্তান প্রদেশে নতুন করে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
অদূর ভবিষ্যতের সংকট ও চ্যালেঞ্জ
যদিও কুর্দিদের মাধ্যমে স্থল অভিযানের এই পরিকল্পনা শুনতে কার্যকর মনে হচ্ছে, তবে এর বাস্তবায়ন মোটেও সহজ হবে না। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) ইতোমধ্যে কুর্দি অঞ্চলগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করেছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, কুর্দি যোদ্ধাদের রণক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ভিন্নতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগত কোন্দল এই পরিকল্পনার সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে সিআইএ-র লক্ষ্য স্পষ্ট—অস্ত্র ও অর্থের বিনিময়ে ইরানের ভেতরে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যাতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলাগুলো আরও নিখুঁতভাবে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবা খেলায় কুর্দি বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত ‘টেকসই তুরুপের তাস’ হতে পারবে নাকি তারা কেবল একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
