চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পারিবারিক শত্রুতার এক ভয়াবহ ও নৃশংস বলি হয়েছে আট বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু ইরা মনি। প্রতিবেশীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই শিশুকে অপহরণ, ধর্ষণের চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা পুলিশ। এই পৈশাচিক ঘটনাটি কেবল একটি জনপদকে স্তব্ধ করেনি, বরং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নৃশংসতার বিবরণ
নিহত শিশু ইরা মনি সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলামের কন্যা। সে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ছিল। অন্যদিকে, এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত বাবু শেখ পেশায় একজন শ্রমিক এবং তিনি ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিবেশী হিসেবে ভাড়া থাকতেন।
তদন্তে জানা গেছে, ইরা মনির বাবা মনিরুল ইসলামের সঙ্গে অভিযুক্ত বাবু শেখের দীর্ঘকাল ধরে পারিবারিক ও তুচ্ছ বিষয়ে বিবাদ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে বাবু শেখ মনে মনে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। গত রোববার সকালে অত্যন্ত সুকৌশলে চকলেট কিনে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ইরা মনিকে তার বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসেন বাবু শেখ। এরপর তাকে বাসে করে কুমিরা থেকে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়।
নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার পর ঘাতক বাবু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণের অপচেষ্টা চালান। শিশুটি ভয়ে চিৎকার শুরু করলে এবং এই ঘটনা বাড়িতে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে পাষণ্ড বাবু শেখ সাথে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলা কেটে ফেলেন। মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে ভেবে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বনাঞ্চলেই ফেলে রেখে পালিয়ে যান ঘাতক।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি ও সময়ক্রম
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত শিশুর নাম | ইরা মনি (বয়স: ০৮ বছর) |
| পিতার নাম ও পেশা | মনিরুল ইসলাম (টমটম চালক) |
| প্রধান অভিযুক্ত | বাবু শেখ (বয়স: ৪৫ বছর) |
| অভিযুক্তের স্থায়ী ঠিকানা | গাইবান্ধা জেলা |
| হত্যাকাণ্ডের স্থান | সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন দুর্গম পাহাড় |
| অপরাধের ধরণ | অপহরণ, ধর্ষণের চেষ্টা ও গলা কেটে হত্যা |
| গ্রেপ্তারের সময় ও স্থান | মঙ্গলবার সকালে, কুমিরার কাজীপাড়া এলাকা থেকে |
উদ্ধার অভিযান ও করুণ মৃত্যু
গলা কাটার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জীবন বাঁচাতে লড়ছিল ছোট্ট ইরা মনি। অলৌকিকভাবে সে জঙ্গল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে পাহাড়ের নিচে নির্মাণাধীন একটি সড়কের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা রক্তাক্ত অবস্থায় শিশুটিকে দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে দ্রুত সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে টানা দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মঙ্গলবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ইরা মনি। তার এই মৃত্যু সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতকের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পুলিশি তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই তারা ছায়া তদন্ত শুরু করেছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং স্থানীয়দের দেওয়া বর্ণনার ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকালেই কুমিরার কাজীপাড়া এলাকা থেকে ঘাতক বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবু শেখ তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভুক্তভোগীর শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মামলার ধারা আরও সুনির্দিষ্ট করা হবে। জেলা পুলিশ সুপার স্পষ্ট করেছেন যে, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পেছনে আর কারো উসকানি বা সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
