মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে একদিনে জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্যানুসারে, দেশটিতে জ্বালানি তেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ১১ সেন্ট বেড়ে ৩.১১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালে প্রলয়ংকরী হারিকেন ক্যাটরিনার পর মার্কিন ইতিহাসে একদিনে দাম বাড়ার ক্ষেত্রে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড।
Table of Contents
সংকটের নেপথ্যে: হরমুজ প্রণালী ও ইরান-ইসরায়েল সংঘাত
বর্তমান এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ বাহিনীর মধ্যকার সংঘাতকে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার জেরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারে হামলা চালানোয় উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আসায় দাম হু হু করে বাড়ছে।
বাজার পরিস্থিতি ও তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র
মঙ্গলবার মার্কিন বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। আগের দিন সোমবারও দাম বেড়েছিল ৬ শতাংশ। নিচে তেলের বর্তমান বাজার পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| খাতের নাম | বর্তমান অবস্থা | পরিবর্তন/হার |
| গড় খুচরা মূল্য (গ্যালনপ্রতি) | ৩.১১ মার্কিন ডলার | ১১ সেন্ট বৃদ্ধি (একদিনে) |
| অপরিশোধিত তেল (ব্যারেলপ্রতি) | ৭৬ মার্কিন ডলার | ৭% বৃদ্ধি |
| সর্বশেষ রেকর্ড বৃদ্ধি | ২০০৫ সাল | হারিকেন ক্যাটরিনার সময় |
| প্রধান সরবরাহ রুট | হরমুজ প্রণালী | বর্তমানে প্রায় অবরুদ্ধ |
খুচরা বাজারে প্রভাব ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ
বিশ্ববাজারে তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও বিশ্লেষকরা কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি দাম বাড়লেও পাম্পগুলোতে খুচরা মূল্যে এর প্রভাব খুব দীর্ঘমেয়াদী নাও হতে পারে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিকস’-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ডেভিড অক্সলে মনে করেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে কিছুটা সময় নেয়। তার মতে, সাধারণ মানুষ পাম্পে যে দাম দেয়, তা তেলের মূল কাঠামোগত দামের একটি ছোট অংশ মাত্র; এর সাথে বিপণন ও করের বিষয়গুলো যুক্ত থাকে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতির চাপে মার্কিন অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও বৈশ্বিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে হামলার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেক বিশ্লেষক। ওপেকের (OPEC) সদস্য দেশগুলো যদি উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করতে না পারে, তবে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও জ্বালানির দাম ও পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি এই অস্থিতিশীলতার মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর যাতায়াত অনিরাপদ থেকে যাবে, যা বিশ্ববাজারকে আরও অস্থির করে তুলবে।