করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে মেরিন সেনাদের গুলিবর্ষণ ও উত্তেজনা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। বিশেষ করে করাচিতে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে অনাকাঙ্ক্ষিত গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, এই সহিংসতায় অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়াশার পর সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, সেই দিন বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে মার্কিন মেরিন সেনারা গুলি চালিয়েছিল।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সহিংসতার সূত্রপাত

ইরানের শীর্ষ নেতার নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে গত রোববার করাচি মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা অবস্থান নেয়। বিক্ষোভের একপর্যায়ে জনতা উত্তেজিত হয়ে কনস্যুলেট প্রাঙ্গণের বাইরের দেয়াল ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং কনস্যুলেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে নিয়োজিত রক্ষীরা গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন।

গত সোমবার (২ মার্চ) দুজন মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন মেরিন সেনারা সেই সময় বলপ্রয়োগ করেছিল। কূটনৈতিক মিশনে মার্কিন সেনাদের সরাসরি গুলিবর্ষণের এই ঘটনা পাকিস্তানে আমেরিকা বিরোধী সেন্টিমেন্টকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে মেরিনদের গুলিতেই ১১ জন নিহত হয়েছেন কি না, নাকি স্থানীয় পুলিশ বা বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মীদের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার বিস্তারিত পরিসংখ্যান ও তদন্তের অবস্থা

নিচে করাচি কনস্যুলেট হামলার প্রাথমিক তথ্যের একটি সারণি দেওয়া হলো:

বিষয়বিবরণ
ঘটনার স্থানমার্কিন কনস্যুলেট, করাচি, সিন্ধু প্রদেশ।
ঘটনার কারণইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড।
নিহতের সংখ্যাঅন্তত ১১ জন (প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী)।
গুলিবর্ষণকারী পক্ষমার্কিন মেরিন সেনা, স্থানীয় পুলিশ ও বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষী।
তদন্তকারী সংস্থাউচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (JIT)।
প্রতিবেদনের সময়সীমা১৫ কার্যদিবস।

সরকারি প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত কমিটি গঠন

সিন্ধু প্রদেশের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী শারজিল মেমন জানিয়েছেন, করাচি কনস্যুলেটের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে একটি বিস্তারিত তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে যে, কার গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং সেখানে মার্কিন মেরিন সেনাদের ভূমিকার আইনি ভিত্তি কী ছিল।

এদিকে সিন্ধু সরকারের মুখপাত্র সুখদেব আসরদাস হেমদানি জানিয়েছেন, ‘নিরাপত্তা’ কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালিয়েছে, তবে তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোন বাহিনীর সদস্য তা নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি না থাকলেও কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সেনারা দেশটিতে অবস্থান করেন।

কূটনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

এই ঘটনাটি পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্ষোভকারীদের ওপর বিদেশি সেনাদের গুলিবর্ষণের ঘটনাটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। করাচি ছাড়াও লাহোর, ইসলামাবাদ এবং কোয়েটায় বড় ধরনের গণবিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হতে হবে এবং কূটনৈতিক পাড়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাহিনীকে প্রধান দায়িত্ব দিতে হবে। ১৫ দিন পর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এই ঘটনার নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।