দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে চাঁদাবাজির অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। উৎপাদন পর্যায়ে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়া পণ্য রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে—যার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে পথে পথে আদায়কৃত অনানুষ্ঠানিক চাঁদা।
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও বৃহৎ সবজির বাজার বগুড়ার মহাস্থান হাটে কৃষকরা সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসেন। এখানেই নির্ধারিত হয় পাইকারি দর। বর্তমানে প্রতি মণ বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায়, যা কেজিপ্রতি দাঁড়ায় আনুমানিক ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা। একইভাবে শসার দামও কেজিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ টাকার মধ্যে রয়েছে।
কিন্তু এই দাম রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিনগুণ হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বাজারে প্রবেশের আগেই হাট পর্যায়ে প্রতিমণে প্রায় ২০ টাকা ‘খাজনা’ বা চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী এই অতিরিক্ত খরচ এড়াতে সরাসরি মাঠ থেকে ট্রাকে পণ্য তুললেও সেখানেও তাদের রেহাই নেই। পরিবহন পথে বিভিন্ন স্থানে ট্রাক থামিয়ে স্লিপ ধরিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
একজন ব্যবসায়ীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈধ বাজার খরচের তুলনায় চাঁদার পরিমাণই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বাজারে পণ্য খালাস করতে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়, সেখানে চাঁদা বাবদ দিতে হচ্ছে প্রায় ১০০০ টাকা। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
ট্রাকচালকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, সড়কের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ ট্রাক থামিয়ে স্লিপের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়।
বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলেও বাস্তবে প্রতিকার কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
পথে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ফলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিচের সারণিতে উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো—
| পর্যায় | মূল্য (প্রতি কেজি) | অতিরিক্ত ব্যয়/চাঁদা | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| উৎপাদন (হাট) | ৩৫–৩৭ টাকা | – | কৃষকের বিক্রয়মূল্য |
| হাট খাজনা | +২–৩ টাকা | প্রতিমণে ~২০ টাকা | স্লিপের মাধ্যমে আদায় |
| পরিবহন পথে | +১০–১৫ টাকা | বিভিন্ন স্থানে আদায় | ট্রাকভিত্তিক চাঁদা |
| নগর আড়ত | +২০–২৫ টাকা | আড়ত খরচ ও মুনাফা | দর নির্ধারণ |
| খুচরা বাজার | ৯০–১০০ টাকা | মোট প্রভাব | ভোক্তার ক্রয়মূল্য |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি পণ্যের মূল্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। যদিও এসব আদায়কে কখনো ‘সমঝোতা’ বা ‘খাজনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, বাস্তবে এটি বাজার ব্যবস্থাকে অস্বচ্ছ করে তুলছে।
প্রশ্ন উঠছে—হাট থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত এই চাঁদাবাজির শৃঙ্খল ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ কি নেওয়া হচ্ছে? এবং তথাকথিত ‘সমঝোতার’ নামে আদায়কৃত অর্থ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকেই যাচ্ছে না কি?
