তিন মাসে খেলাপি ঋণ হ্রাস: ব্যাংক খাতে স্বস্তি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অস্থিরতার মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা কমেছে। ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর পর এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে ব্যাংক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে ঋণের পাহাড় কমলেও সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। অথচ এর আগের প্রান্তিকে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা (মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ)। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।

নিচে ব্যাংক খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের তুলনামূলক হার দেওয়া হলো:

ব্যাংকের ধরনখেলাপি ঋণের হার (শতাংশ)মন্তব্য
রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক৪৪.৪৪%সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার।
বিশেষায়িত ব্যাংক৩৯.৭৪%কৃষি ও শিল্প ঋণের আধিক্য।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক২৮.২৫%খেলাপি ঋণ কমার মূল প্রভাব এখানে।
বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক৪.৫১%তুলনামূলক স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত।
সামগ্রিক গড়৩০.৬০%পূর্ববর্তী ৩৬% থেকে হ্রাস।

হ্রাসের কারণ ও নেপথ্য বিশ্লেষণ

হঠাৎ করে খেলাপি ঋণ কমার পেছনে বেশ কিছু নীতিগত ও কৌশলগত কারণ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের নীতিমালায় পরিবর্তন এবং হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ এই কমতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ব্যাংকগুলো আদায় অযোগ্য অনেক ঋণ ‘অবলোপন’ (Write-off) করার মাধ্যমেও তাদের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু কাগজে-কলমে কমালে হবে না, প্রকৃত আদায়ের হার বৃদ্ধি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যমান ঝুঁকি ও মন্দ ঋণের প্রভাব

পরিসংখ্যানের এই স্বস্তির আড়ালেও লুকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগ। মোট খেলাপি ঋণের একটি বিশাল অংশ—অর্থাৎ ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা ‘মন্দ’ বা ‘ক্ষতিজনক’ হিসেবে চিহ্নিত। ব্যাংকিং পরিভাষায় এই ঋণগুলো কার্যত আদায় অযোগ্য। যখন কোনো ঋণ মন্দ মানে পরিণত হয়, তখন ব্যাংককে সেই অর্থের বিপরীতে শতভাগ ‘প্রভিশন’ বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের নিট মুনাফা কমে যায় এবং মূলধনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়।

অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব

খেলাপি ঋণের উচ্চহার কেবল ব্যাংকের জন্য নয়, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি নীরব ঘাতক। যখন ব্যাংকের টাকা আটকে যায়, তখন নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন। বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিলে কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়। এছাড়া ঝুঁকি সামলাতে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, যা সৎ ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ঋণের বোঝা আরও ভারী করে তোলে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যখন মূলধনের ঘাটতি দেখা দেয়, তখন সরকারকে জনগণের করের টাকা থেকে বাজেট সহায়তা দিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে।

সার্বিকভাবে, ৮৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমে আসা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি দীর্ঘশ্বাসের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে হলে আইনি কাঠামোর সংস্কার, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।