অগ্নিগর্ভ মধ্যপ্রাচ্য: খামেনি পরবর্তী সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিরতা

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র জুড়ে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছে। বর্তমানে এই সংঘাত কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তেহরানের আকাশে যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যাচ্ছে, ঠিক তখনই পাল্টা জবাবে ইরান ও তার মিত্র দেশগুলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও অভিযানসমূহ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে তাদের এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, অন্যদিকে ইসরায়েল একে অভিহিত করেছে ‘লায়ন রোর’ হিসেবে। যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটেছে লেবানন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং এমনকি সাইপ্রাস পর্যন্ত। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে, তবে প্রয়োজনে এর সময়সীমা আরও বাড়ানো হবে।

হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে দেশটিতে অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বেসামরিক নাগরিক। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবন ও কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। সংঘাতের এই ভয়াবহ রূপ নিচের সারণির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট করা হলো:

পক্ষ/দেশনিহতের সংখ্যাপ্রধান ক্ষয়ক্ষতি
ইরান৫৫৫+ জননাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু স্থাপনা, আইআরজিসি সদর দপ্তর, ১৩১টি শহরে হামলা।
ইসরায়েল১০ জনপ্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনে হামলা, বিরসেবা সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত।
যুক্তরাষ্ট্র৪ জন সেনা৩টি এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, কুয়েত ও কাতার ঘাঁটিতে হামলা।
অন্যান্য দেশ৭ জন (৩ জন আমিরাত, ২ জন ইরাক, ১ জন কুয়েত, ১ জন বাহরাইন)জ্বালানি ট্যাঙ্কার, তেল শোধনাগার (রাস তানুরা) ও গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত।

কৌশলগত ও সামরিক বিপর্যয়

যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে কুয়েতে তিনটি এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, কুয়েতি বাহিনীর ভুল করে ছোঁড়া গুলিতে এগুলো ভূপাতিত হয়। এদিকে, ইরান তার ‘কৌশলগত গভীরতা’ ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। আবুধাবিতে তেলের ট্যাঙ্কার এবং সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।

লেবানন ফ্রন্ট ও হিজবুল্লাহর ভূমিকা

খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে হিজবুল্লাহর গোয়েন্দা প্রধান হুসেইন ম্যাকলেডকে হত্যার দাবি করেছে। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্রের মতে, লেবাননে স্থল অভিযানের জন্য তারা প্রায় ১ লাখ সংরক্ষিত সেনা প্রস্তুত রেখেছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণ লেবানন থেকে প্রায় ২৮,৫০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

পেন্টাগন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই কৌশল বড় ধরণের ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। গবেষক ট্রিটা পারসির মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলে ইরান নতি স্বীকার করবে। কিন্তু ইরানি শাসনব্যবস্থা যুদ্ধের চেয়ে আত্মসমর্পণকে বেশি ভয় পায়। বর্তমানে তেহরানের মনোভাব ‘যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া ভালো, কিন্তু নতি স্বীকার নয়’।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতও ট্রাম্পের বিপক্ষে যাচ্ছে। রয়টার্স-ইপসস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ সমর্থন করছেন। ন্যাটোর পক্ষ থেকে এই যুদ্ধে সরাসরি না জড়ানোর ঘোষণা আসায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এককভাবেই সামলাতে হতে পারে।