খামেনির পর অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে ইরান

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবরে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক অস্থিরতার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যু ঘটেছে বলে বিভিন্ন আঞ্চলিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ও আদর্শিক কাঠামোর শীর্ষে থাকা এই নেতার আকস্মিক অনুপস্থিতি ক্ষমতার ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং উত্তরসূরি নির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরসহ কয়েকটি স্থানে বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একটি কন্যাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। হতাহতের নির্ভরযোগ্য সংখ্যা এখনো নিশ্চিত না হলেও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত জনগণের ওপর এর মানবিক প্রভাব আরও গভীর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

১৯৮৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর খামেনি দেশের নিরাপত্তা নীতি, আঞ্চলিক জোট ও পরমাণু কর্মসূচির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর মৃত্যুর আগেই বাস্তব ক্ষমতার ভার কিছুটা স্থানান্তরিত হচ্ছিল। সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়।

নিম্নের সারণিতে সম্ভাব্য প্রধান শক্তিগুলোর ভূমিকা তুলে ধরা হলো—

প্রতিষ্ঠান বা পক্ষসম্ভাব্য ভূমিকাবর্তমান অবস্থান
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদসামরিক ও কৌশলগত সমন্বয়রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া পরিচালনায় সক্রিয়
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীঅভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বহির্বিশ্বে সামরিক তৎপরতাসুসংগঠিত ও শক্তিশালী
সংস্কারপন্থী ও বিরোধী গোষ্ঠীজনমত সংগঠিত করানেতৃত্বে বিভক্ত
ধর্মীয় নেতৃবৃন্দউত্তরাধিকার বৈধতা প্রদানমতভেদ বিদ্যমান

রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো ভেঙে পড়েনি। বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ইঙ্গিত দেয় যে পরিবর্তন প্রক্রিয়া কঠোর তদারকির মধ্য দিয়ে এগোবে।

অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

গত ডিসেম্বরেই অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক দমননীতির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়িতে আন্দোলন স্তিমিত হলেও জনঅসন্তোষ রয়ে যায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সময় বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানান এবং সাম্প্রতিক ঘটনার পর ইরানিদের “নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারের” আহ্বান জানান।

তবে বাস্তবতা জটিল। নির্বাসিত রাজপরিবারের উত্তরসূরি রেজা পাহলভি-র নাম সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এলেও অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ কোনো নেতৃত্ব এখনো দৃশ্যমান নয়। ইতিহাসবিদ আরাশ আজিজি সতর্ক করে বলেছেন, এমন উত্তরণকাল প্রায়ই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয় এবং ভুল ব্যবস্থাপনায় তা গৃহসংঘাতে রূপ নিতে পারে।

আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাব

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু একটি স্থিতিশীল ও সংস্কারমুখী ইরান কি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থে সহায়ক হবে, নাকি দুর্বল ও বিভক্ত প্রতিবেশীই কৌশলগতভাবে অধিক সুবিধাজনক—এই প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

সব মিলিয়ে ইরান এক সন্ধিক্ষণে। বহিরাগত সামরিক চাপ কোনো শাসনব্যবস্থাকে টলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু টেকসই ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে না। আগামীর পথ নির্ধারিত হবে দেশের প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব এবং নাগরিকদের সিদ্ধান্ত ও সক্ষমতার ওপর।