মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের দখলে। গত শনিবার সকালে ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তেহরানের পাল্টা আঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র অঞ্চল। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ইরানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এক বাংলাদেশি নাগরিকসহ অন্তত চারজন। এই ঘটনায় ওই অঞ্চলে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
Table of Contents
হামলার প্রেক্ষাপট ও আমিরাতের ক্ষয়ক্ষতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে পশ্চিমা জোটের হামলার পর ইরান তার ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের পূর্ণ শক্তি নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এই আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের আঘাতে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে, শনিবার একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও রোববার (১ মার্চ) নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অন্তত ৫৮ জন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তৎপরতা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানি হামলার তীব্রতা ছিল নজিরবিহীন। প্রতিরক্ষা বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আকাশপথে আসা অধিকাংশ হুমকি মোকাবিলা করেছে। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
নিম্নে আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শনাক্ত ও ধ্বংস করা ইরানি সমরাস্ত্রের একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| সমরাস্ত্রের ধরন | মোট শনাক্তকৃত সংখ্যা | ধ্বংস করা হয়েছে | সাফল্যের হার (প্রায়) |
| ব্যালিস্টিক মিসাইল | ১৬৫টি | ১৫২টি | ৯২.১২% |
| ক্রুজ মিসাইল | ২টি | ২টিকে (সবগুলো) | ১০০% |
| সশস্ত্র ড্রোন | ৫৪১টি | ৫০৬টি | ৯৩.৫৩% |
নিহতদের পরিচয় ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি। আমিরাত কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সর্বশেষ নিহতের তালিকায় চারজন প্রবাসী শ্রমিকের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া বাকি তিনজনের মধ্যে একজন পাকিস্তানের এবং একজন নেপালের নাগরিক বলে নিশ্চিত করা হয়েছে (চতুর্থজনের পরিচয় এখনো যাচাইাধীন)।
আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিসগুলো বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। নিহত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকতে এবং বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো আমিরাতেও মার্কিন ঘাঁটি থাকায় এই দেশগুলো এখন ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো থেকে আসা লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
