ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader বা রাহবার) পদটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় পদ নয়; বরং ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক তত্ত্বাবধান এবং রাষ্ট্রের আদর্শিক দিকনির্দেশনার সমন্বিত কেন্দ্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ২ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ইরান মাত্র দুইজন সর্বোচ্চ নেতার অধীনে পরিচালিত হয়েছে—আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই। কিন্তু তাঁদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া এক নয়। একজন বিপ্লবের মাধ্যমে স্বীকৃত নেতা; অন্যজন সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর ভোটে নির্বাচিত। আর আজ, খামেনেই-পরবর্তী শূন্যতায়, সেই কাঠামো আবারও পরীক্ষার মুখে।
Table of Contents
আগের নেতাদের নির্বাচনের ইতিহাস:
১. ‘বেলায়েত–এ–ফকিহ’ থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো: পদটির জন্ম
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পদের ধারণাগত ভিত্তি হলো ‘বেলায়েত–এ–ফকিহ’—অর্থাৎ ইসলামী আইনবিশারদের শাসন। শিয়া রাজনৈতিক চিন্তায় এর শিকড় থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একে প্রতিষ্ঠা করেন আয়াতুল্লাহ খোমেনী। তাঁর যুক্তি ছিল—গায়েব ইমামের অনুপস্থিতিতে একজন যোগ্য ফকিহ (ইসলামী আইনজ্ঞ) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর পতনের পর খোমেনী নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন। ১ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রত্যাবর্তনের দিন তেহরানে লাখো মানুষের সমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা ছিল। মার্চ ১৯৭৯-এ অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৮.২% ভোটার “ইসলামী প্রজাতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন। এই গণভোট খোমেনীর নেতৃত্বকে পরোক্ষ বৈধতা দেয়।
এরপর আগস্ট ১৯৭৯-এ সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষ পরিষদ নির্বাচিত হয়—৭৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এই পরিষদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিল। এই পরিষদ সংবিধানে ‘সর্বোচ্চ নেতা’ পদ অন্তর্ভুক্ত করে এবং খোমেনীকে কার্যত আজীবনের জন্য সেই পদে প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ খোমেনী কোনো আনুষ্ঠানিক ভোটাভুটিতে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হননি; তিনি ছিলেন বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা, যাঁকে পরে সাংবিধানিক কাঠামো বৈধতা দেয়।
২. আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী (১৯৭৯–১৯৮৯): বিপ্লবী কর্তৃত্বের যুগ
খোমেনীর দশ বছর ছিল রাষ্ট্র নির্মাণের সময়। তিনি কেবল ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিপ্লবের প্রতীক। তাঁর সময়ে—
- ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮) সংঘটিত হয়।
- বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) শক্তিশালী হয়।
- রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করা হয়।
- রাষ্ট্রের কাঠামোতে ধর্মীয় তত্ত্বাবধান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
তাঁর কর্তৃত্ব ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। রাষ্ট্রপতি, সংসদ, বিচার বিভাগ—সবই শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধান্তের অধীন। এই সময়েই ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ (মজলিস-এ-খবরেগান) নামের স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, যাদের দায়িত্ব ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও তদারকি করা।
৩ জুন ১৯৮৯-এ খোমেনীর মৃত্যু ইরানের জন্য প্রথম উত্তরাধিকার সংকট তৈরি করে। বিপ্লবের স্থপতির পর কে?
৩. ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’: কারা, কীভাবে, কেন
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। তাঁকে নির্বাচন করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস—৮৮ সদস্যের একটি পরিষদ, যাঁরা মূলত মুজতাহিদ বা ইসলামী আইনবিশারদ।
- সদস্যরা জনগণের ভোটে ৮ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
- কিন্তু প্রার্থীদের যাচাই করে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, যা নিজেই সর্বোচ্চ নেতার তত্ত্বাবধানে।
- তাদের প্রধান কাজ:
১. সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন
২. তাঁর কার্যক্রম তদারকি
৩. প্রয়োজনে অপসারণ
এই কাঠামো তাত্ত্বিকভাবে জনগণ-নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তবে এটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি অভ্যন্তরীণ চক্র।
৪. ১৯৮৯: আলী খামেনেইর অপ্রত্যাশিত উত্থান
খোমেনীর মৃত্যুর পর ৪ জুন ১৯৮৯-এ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস জরুরি বৈঠকে বসে। পরিস্থিতি ছিল অস্থির। প্রথমে প্রস্তাব ওঠে একটি ‘লিডারশিপ কাউন্সিল’ গঠনের—তিন বা পাঁচ সদস্যের একটি সমষ্টিগত নেতৃত্ব। কিন্তু তা বাতিল হয়। সিদ্ধান্ত হয়—একজন একক নেতা।
সেই সময় সংবিধানে বলা ছিল, সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে ‘মারজা-ই-তাকলিদ’—অর্থাৎ সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হতে হবে। আলী খামেনেই তখন সেই মর্যাদার ছিলেন না; তিনি ছিলেন ‘হোজ্জাতুল ইসলাম’ এবং সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি।
তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা হাশেমি রাফসানজানি দাবি করেন—খোমেনী মৃত্যুর আগে মৌখিকভাবে খামেনেইকে যোগ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই দাবি বৈঠকের গতি বদলে দেয়। ভোট হয়। উপস্থিত ৭৪ জনের মধ্যে ৬০ জন খামেনেইর পক্ষে ভোট দেন—দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।
এরপর সংবিধান সংশোধন করা হয়। ‘মারজা’ হওয়ার শর্ত শিথিল করা হয়, যাতে একজন ‘যোগ্য ফকিহ’—অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ পর্যায়ের আলেম—সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন। গণভোটে সংশোধনী পাস হয়। এভাবেই খামেনেই আইনি বৈধতা পান।
৫. আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই (১৯৮৯–২০২৬): ক্ষমতার সংহতি
খামেনেইর ৩৬ বছরের শাসন ইরানের ইতিহাসে দীর্ঘতম। তাঁর সময়ের বৈশিষ্ট্য—
- IRGC-এর অস্বাভাবিক ক্ষমতাবৃদ্ধি
- অর্থনীতিতে সামরিক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য
- পরমাণু কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
- সংস্কারপন্থী বনাম কট্টরপন্থী দ্বন্দ্ব
- গণবিক্ষোভ (২০০৯, ২০১৯, ২০২২)
খামেনেই ধীরে ধীরে এমন একটি ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—গার্ডিয়ান কাউন্সিল, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার, সামরিক বাহিনী—তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল।
৬. ২০২৬: শূন্যতার মুহূর্ত
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় আলী খামেনেই নিহত হয়েছেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো ইরান একটি পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক শূন্যতার মুখে।
সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
- অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসকে অবিলম্বে বৈঠকে বসতে হবে।
- নতুন নেতা গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন।
- ততক্ষণ পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল দায়িত্ব পালন করবে—রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেম সদস্য।
কিন্তু বাস্তবতা জটিল। চলমান যুদ্ধ, অব্যাহত বিমান হামলা এবং নিরাপত্তা অস্থিতিশীলতার কারণে ৮৮ সদস্যের একত্র হওয়া কঠিন। এই সুযোগে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) নিজেকে ‘কিংমেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে।
ক্ষমতার নতুন সমীকরণ
খামেনেই-পরবর্তী ইরান কেবল একজন নতুন ধর্মীয় নেতার সন্ধানে নেই; এটি একটি ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের মুহূর্ত। ১৯৮৯ সালে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত—রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষত ছিল, যুদ্ধ চলছিল না, এবং বিপ্লবী প্রজন্ম এখনও সক্রিয় ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। বহিরাগত সামরিক চাপ, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং IRGC-এর অতিমাত্রায় শক্তিশালী অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল উত্তরাধিকার সংকট।
১. সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বনাম বাস্তব রাজনীতি
সংবিধান অনুযায়ী অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস গোপন ব্যালটে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ভোট কি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হবে? পরিষদের সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও তাঁদের প্রার্থীতা অনুমোদন করে গার্ডিয়ান কাউন্সিল, যার অর্ধেক সদস্য সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার মনোনীত। ফলে কাঠামোগতভাবে এটি একটি আত্ম-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় ৮৮ সদস্যের একত্র হওয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে কঠিন। এই পরিস্থিতিতে IRGC-এর কমান্ড স্ট্রাকচার আইনি কাঠামোর বাইরে দ্রুত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। যদি তারা আগে থেকেই ঐকমত্য তৈরি করে, তবে অ্যাসেম্বলি কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিতে পারে।
এখানেই ২০২৬ সালের সংকট ১৯৮৯ সালের থেকে আলাদা: তখন ধর্মীয় নেতারা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন; এখন সামরিক শক্তি সরাসরি প্রভাব বিস্তার করছে।
২. সম্ভাব্য প্রার্থীরা: ক্ষমতার বলয়ের ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
মোজতবা খামেনেই
মোজতবা খামেনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইর দ্বিতীয় পুত্র। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই জনসম্মুখের রাজনীতি এড়িয়ে পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক পদে না থাকলেও দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করেন। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর গোয়েন্দা শাখা ও উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের কথা প্রায়ই আলোচনায় আসে। এই কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক তাঁকে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর “ডি ফ্যাক্টো” অংশ হিসেবে দেখেন।
মোজতবার সম্ভাব্য শক্তির দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সামরিক সমর্থন। আইআরজিসির একটি অংশ তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল—এমন ধারণা প্রচলিত আছে, যা ক্ষমতার রদবদলের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি তিনি পিতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেটওয়ার্কে সরাসরি প্রবেশাধিকার রাখেন, যা ইরানের জটিল ক্ষমতা কাঠামোয় একটি বড় সুবিধা। আরও একটি বিষয় হলো ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি। আলী খামেনেই-পরবর্তী সময়ে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রশ্নে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাঁকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখতে পারে।
তবে তাঁর সামনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘বংশগত শাসন’ ধারণা ঐতিহাসিকভাবে অজনপ্রিয়, বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয়েছিল। ফলে পিতার উত্তরসূরি হিসেবে পুত্রের আবির্ভাব অনেকের কাছে সেই পুরোনো ব্যবস্থার প্রতিধ্বনি মনে হতে পারে। এছাড়া তাঁর ধর্মীয় মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন আছে, কারণ সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে উচ্চস্তরের ধর্মীয় স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জনঅসন্তোষ বা রাজনৈতিক বিরোধিতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, যদি মোজতবা খামেনেইকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, তবে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কার্যত একটি আধা-বংশগত ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকতে পারে—যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
আলীরেজা আরাফি
আলীরেজা আরাফি ইরানের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাওজা (শিয়া ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র) প্রশাসন ও তত্ত্বাবধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ধর্মীয় পাণ্ডিত্য, প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠিত আলেম হিসেবে তাঁর পরিচিতি তাঁকে রক্ষণশীল মহলে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পাশাপাশি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইর প্রতি তাঁর আনুগত্যও তাঁকে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে একটি বিশ্বাসযোগ্য মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরাফির মূল শক্তি হলো তাঁর ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে উচ্চস্তরের ধর্মীয় মর্যাদা ও ফিকহ-জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এই দিক থেকে তিনি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে আছেন। একই সঙ্গে তিনি সরাসরি সামরিক বা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করেন না, ফলে তাঁকে একটি “সিভিল-রিলিজিয়াস” বিকল্প হিসেবে দেখা যায়। রক্ষণশীল রাজনীতির ভেতরে থেকেও তিনি তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, আলীরেজা আরাফি একটি আপসের প্রার্থী (compromise candidate) হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন—বিশেষ করে যদি ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন হয়। তিনি ধর্মীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হবেন, আবার একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বা সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর সম্ভাবনাও কম। ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর নাম গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে তাঁর প্রভাব কতটা বিস্তৃত এবং জনসমর্থন কতটা রয়েছে—সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তিনি তুলনামূলকভাবে কম জনআলোচিত ব্যক্তি, যা একদিকে তাঁকে কম বিতর্কিত রাখে, অন্যদিকে জনপরিসরে তাঁর প্রোফাইলকে সীমিত করে। সব মিলিয়ে, আলীরেজা আরাফি এমন এক প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, যিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সামনে আসতে পারেন এবং ধারাবাহিকতার সঙ্গে স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে সক্ষম।
গোলাম হোসেন মহসেনি–এজেই
গোলাম হোসেন মহসেনি-এজেই বর্তমানে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কর্মজীবন মূলত বিচার, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কৌশলগত অংশগুলোর সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ গড়ে উঠেছে। কট্টরপন্থী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত।
মহসেনি-এজেইর শক্তির জায়গা হলো তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিতি। রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা তাঁকে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর কাছে আস্থার প্রতীক করে তুলেছে। বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর সময়কালে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বিরোধিতার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান লক্ষ করা গেছে—যা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি তিনি উচ্চতর নেতৃত্বের দায়িত্বে আসেন, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংস্কারপন্থী রাজনীতির পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আদর্শিক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, তাঁর এমন অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলতে পারে। কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতি ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে, গোলাম হোসেন মহসেনি-এজেইর সম্ভাব্য উত্থান মানে হবে একটি শক্ত নিয়ন্ত্রণভিত্তিক শাসনধারার আরও সুসংহত রূপ, যেখানে সংস্কারপন্থীদের জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
হাসান খোমেনী
হাসান খোমেনী ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নাতি। পারিবারিক ঐতিহ্য ও বিপ্লবী উত্তরাধিকারের কারণে তিনি ইরানের রাজনৈতিক পরিসরে একটি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করেন। সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থী মহলে তিনি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় মুখ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর নাম অনেকের কাছে ইরানের আদর্শিক শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, বিশেষ করে বিপ্লবের প্রাথমিক ন্যায়বিচার, জনসম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতীক হতে পারে।
হাসান খোমেনীর শক্তির জায়গা হলো তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় পরিচিতি। খোমেনী পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই একটি ঐতিহাসিক ও আবেগগত বৈধতা লাভ করেন, যা ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তিনি সরাসরি কট্টর নিরাপত্তা বলয়ের প্রতিনিধি নন, ফলে তাঁকে তুলনামূলকভাবে “নরম” বা সমন্বয়মূলক নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখা হয়। সংস্কারপন্থীরা মনে করেন, তাঁর নেতৃত্ব ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা উন্মুক্ততা ও ভারসাম্য আনতে পারে।
তবে তাঁর সামনে বড় বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রশ্ন। গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও কট্টরপন্থী রাজনৈতিক বলয় তাঁকে কতটা গ্রহণ করবে—সেটিই মূল অনিশ্চয়তা। অতীতে প্রার্থিতা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর নাম নিয়ে বিতর্ক দেখা গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ক্ষমতার রক্ষণশীল অংশ তাঁকে পুরোপুরি আস্থায় নেয়নি।
যদি কখনো তিনি উচ্চতর নেতৃত্বের জন্য মনোনীত বা অনুমোদিত হন, তবে সেটি ইরানের রাজনীতিতে একটি তুলনামূলক নরম মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে কঠোর নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক অবস্থানের বদলে কিছুটা সমঝোতামূলক ও সংস্কারমুখী বার্তা প্রকাশ পেতে পারে—যদিও বাস্তবে সেই পরিবর্তনের পরিধি কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর ভারসাম্যের ওপর।
আলী লারিজানি
আলী লারিজানি ইরানের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, যিনি অতীতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বহু বছর এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তাঁকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুখ হিসেবে তুলে ধরে।
লারিজানির শক্তি হলো তাঁর বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতা। তিনি পুরোপুরি কট্টরপন্থী শিবিরের প্রতিনিধি নন, আবার সংস্কারপন্থীদেরও সম্পূর্ণ বিরোধী নন। বরং তাঁকে অনেক সময় বাস্তববাদী (pragmatic) রক্ষণশীল হিসেবে দেখা হয়। সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে তাঁর পূর্বসূত্র যেমন রয়েছে, তেমনি বেসামরিক প্রশাসন ও আইনসভায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও আছে। ফলে তিনি ক্ষমতার দুই বলয়ের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরিতে সক্ষম হতে পারেন—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রচলিত।
তাঁকে “স্থিতিশীলতা” বিকল্প হিসেবে দেখার কারণও এখানেই। ইরানের জটিল ক্ষমতাকাঠামোয় যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক প্রভাব ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে লারিজানির মতো একজন অভিজ্ঞ ও সমঝোতামূলক ব্যক্তিত্ব অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান কার্যকর হতে পারে।
তবে তাঁর সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করবে ক্ষমতার প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থনের ওপর। সব মিলিয়ে, আলী লারিজানি এমন এক বিকল্প, যিনি ইরানের সামরিক ও বেসামরিক বলয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল রূপান্তরের প্রতীক হতে পারেন।
৩. IRGC: নতুন ‘কিংমেকার’
২০২৬ সালের মার্চে IRGC কার্যত ইরানের সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। তারা শুধু সামরিক বাহিনী নয়; অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি খাত এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক—সবখানেই তাদের উপস্থিতি।
খামেনেইর মৃত্যুর পরপরই তারা—
- উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে
- বড় শহরগুলোতে বাসিজ মিলিশিয়া মোতায়েন করেছে
- নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে
এটি একটি সংকেত: নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগেই সামরিক শক্তি বাস্তব নিয়ন্ত্রণে।
IRGC কেন এত আগ্রহী?
১. অস্তিত্ব রক্ষা—নরমপন্থী নেতা এলে তাদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য সংকুচিত হতে পারে।
২. যুদ্ধের ধারাবাহিকতা—তারা ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নীতি বজায় রাখতে চায়।
৩. অভ্যন্তরীণ দমন—গণবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান ইতোমধ্যেই একটি ‘ডি ফ্যাক্টো’ সামরিক শাসনের দিকে এগোচ্ছে—সামনে ধর্মীয় মুখ, পেছনে জেনারেলদের সিদ্ধান্ত।
৪. তিনটি সম্ভাব্য গতিপথ
ধারাবাহিক ধর্মতন্ত্র
অ্যাসেম্বলি দ্রুত একজন কট্টরপন্থী আলেম নির্বাচন করবে। কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে। IRGC পর্দার আড়ালে প্রভাব বজায় রাখবে। এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল কিন্তু কঠোর পথ।
সামরিক প্রাধান্য
একজন ধর্মীয় নেতা নির্বাচিত হলেও প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে IRGC-এর জেনারেলদের হাতে। এটি একটি আধা-সামরিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের সূচনা হতে পারে।
রাজনৈতিক ধস
যদি অ্যাসেম্বলি ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, বা জনঅসন্তোষ বিস্ফোরিত হয়, তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, এমনকি গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এটি ১৯৭৯-পরবর্তী কাঠামোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
৫. ভবিষ্যতের প্রশ্ন
- ইরান কি ধর্মীয় বৈধতার কাঠামো ধরে রাখতে পারবে?
- IRGC কি সরাসরি রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠবে?
- জনগণের ভূমিকা কি কেবল দর্শক থাকবে, নাকি নতুন গণআন্দোলনের সূত্রপাত হবে?
- আন্তর্জাতিক চাপ কি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ক্ষমতার গভীর পুনর্বিন্যাস। খোমেনীর বিপ্লবী ক্যারিশমা এবং খামেনেইর দীর্ঘ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের পর ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা—তিনটি বলয়ের সংঘর্ষে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসই ঠিক করবে—ইরান কি তার ধর্মতান্ত্রিক কাঠামো টিকিয়ে রাখবে, নাকি একটি নতুন ধরনের সামরিক-ধর্মীয় রাষ্ট্রে রূপ নেবে।
