খামেনির বাসভবন চত্বরে হামলা ও স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শনিবার (১ মার্চ, ২০২৬) সকালে সংগৃহীত সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির তেহরানস্থ বাসভবন ও কার্যালয় চত্বরের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এয়ারবাসের সরবরাহ করা উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ছবিতে খামেনির সেই সুরক্ষিত কম্পাউন্ডের ভেতর থেকে ঘন কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা গেছে। এই ঘটনাটি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে সরাসরি আঘাত হানার এক নজিরবিহীন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দেশজুড়ে ভয়াবহ যৌথ অভিযান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী শনিবার ভোরে ইরানের অন্তত ২০টি প্রদেশে একযোগে সিরিজ ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। এই বিধ্বংসী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের কৌশলগত সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কার্যালয়সমূহ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮৫ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’। এই বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

নিচে হামলার শিকার হওয়া প্রধান অঞ্চল ও ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:

হামলার অঞ্চল/স্থানক্ষয়ক্ষতির প্রকৃতিবিশেষ মন্তব্য
সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ড (তেহরান)চত্বরের একাংশ ধ্বংস ও অগ্নিকাণ্ড।খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা।
মিনাব (হরমোজগান প্রদেশ)একটি বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি আঘাত।৮৫ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মৃত্যু নিশ্চিত।
সামরিক লক্ষ্যবস্তু (২০টি প্রদেশ)ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র ও রাডার স্টেশন।ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আংশিক বিকল।
হরমোজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকানৌ-ঘাঁটি ও জ্বালানি মজুত কেন্দ্র।বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন।

খামেনির অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে ধোঁয়াশা

সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনে হামলার পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি জীবিত আছেন কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। যদিও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তার জানামতে সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদ ও জীবিত আছেন। তবে দীর্ঘক্ষণ খামেনিকে প্রকাশ্যে না দেখা যাওয়ায় এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার কোনো ভিডিও বার্তা প্রচারিত না হওয়ায় জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষবিন্দুতে এই আঘাত দেশটির চেইন অফ কমান্ডকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবিক সংকট

এই ভয়াবহ হামলার পর ইরানজুড়ে এক চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চূড়ান্ত জবাব হিসেবেই তারা এই ‘অপারেশন সোর্ড অফ জাস্টিস’ পরিচালনা করছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন দাবি করেছে যে তারা কেবল ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সহযোগিতা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ৮৫ জনের মৃত্যু এবং খামেনির কার্যালয়ে সরাসরি আঘাতের পর ইরান এখন কোনো প্রক্সি যুদ্ধ নয়, বরং সরাসরি এক বিধ্বংসী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। হরমোজ প্রণালী বন্ধ এবং জ্বালানি সংকটের এই আবহে খামেনির বাসভবনে হামলার এই স্যাটেলাইট চিত্র সারা বিশ্বের শেয়ার বাজার ও ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থির কম্পন সৃষ্টি করেছে। আগামী কয়েক ঘণ্টা ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ।