সকালের আলো ফুটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় রাজধানী ও শহরাঞ্চলের মানুষের মশার সঙ্গে দিনের যুদ্ধ। মহাখালীর আমতলী কাঁচাবাজারের দোকানি ইসমাইল হোসেন তার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “সকালে দোকান খোলা থেকে রাত পর্যন্ত মনে হয় আমার শরীরে হাজার মশা কামড়িয়েছে। পায়ে মোজা পরে থাকি, তবুও হাতে-মুখে লাল দাগ দেখা যায়। কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাট—কিছুতেই মশা দমন হচ্ছে না। দোকানে তো আর মশারি খাটিয়ে বসে থাকতে পারি না।”
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন শহরে মশার উৎপাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিউলেক্স মশা দিন-রাত মানুষকে কামড়াচ্ছে, আর এডিস মশার সঙ্গে ডেঙ্গুর হুমকিও বাড়ছে। মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় খাল-বিল, ডোবা ও পরিত্যক্ত টায়ারে কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত সরেজমিন মাঠে গিয়ে মশার ওষুধের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করেছেন। রাজধানীর সায়েদাবাদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “কিউলেক্স মশার বৃদ্ধি ভয়াবহ। আমরা এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করেছি। খাল-নালা পরিষ্কার করে, সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করে মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।”
ডিএনসিসি ওষুধ সংরক্ষণাগার পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, “জলের স্থলে মশা নিধনে স্পিডবোট ব্যবহার করা হবে। টবের পানি, পরিত্যক্ত টায়ার এডিস মশার জন্মস্থান। বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, “এডিস ও কিউলেক্স মশার নিয়ন্ত্রণ আলাদা। ঢাকার প্রায় ৮০% এডিস মশা জন্মায় তিনটি জায়গায়: নির্মাণাধীন ভবনের পানি জমে থাকা মেঝেতে ৪৭%, বাড়ির নিচতলায় ১৭% এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ১৫%। তাই লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে।”
শহরভিত্তিক পরিস্থিতি
নিম্নের টেবিলে দেশের প্রধান শহরগুলোতে মশার উৎপাত ও ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য সংক্ষেপে দেখানো হলো:
| জেলা/শহর | মশার উৎপাত | প্রধান কারণ | ডেঙ্গু আক্রান্ত (গত ১ বছরে) | মৃত্যু সংখ্যা |
|---|---|---|---|---|
| রাজবাড়ী | অতিষ্ঠকর | আবর্জনা, বন্ধ ড্রেন | – | – |
| পটুয়াখালী | গুরুতর | অপরিষ্কার ড্রেন, ময়লা | ৫০০+ | ৫ |
| ময়মনসিংহ | ভয়াবহ | জমে থাকা পানি, আবর্জনা | – | – |
| বাগেরহাট | মারাত্মক | পরিষ্কার না হওয়া ড্রেন | ২৫৬ | ৫ |
| কুড়িগ্রাম | বৃদ্ধি পেয়েছে | জলাবদ্ধতা, নালা-ডোবা | – | – |
| রংপুর | গুরুতর | শ্যামাসুন্দরী ও ক্যাডি খাল | – | – |
| রাজশাহী | ভয়াবহ | শহরব্যাপী মশার বিচরণ | – | – |
| নারায়ণগঞ্জ | মারাত্মক | অপরিষ্কার নালা, ড্রেন | – | – |
| সিলেট | অতিষ্ঠ | কার্যকর ব্যবস্থা অনুপস্থিত | – | – |
| চট্টগ্রাম | সীমিত | প্রান্তিক ওষুধ প্রয়োগ | – | – |
দেশের অন্য শহরগুলোও একই সমস্যায় ভুগছে। মশা শুধু রাতের নয়, দিনেও কামড়াচ্ছে। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগপ্রবণ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিধনে সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম, নড়াইল, মুন্সিগঞ্জ, মেহেরপুর, গাজীপুর, দিনাজপুরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েল, স্প্রে, মশারি ব্যবহার করলেও রেহাই নেই।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ড্রেন, খাল, ডোবা পরিষ্কার করা, জমে থাকা পানি দূর করা, লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা এবং লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ ছিটানো ছাড়া মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করবে।
রাজধানী ও জেলা শহরগুলোতে মশার উৎপাত ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জাতীয়ভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া সাধারণ মানুষ এই সমস্যার মোকাবিলা একা করতে পারবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে, আগামী বর্ষায় মশার কামড়ে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য। মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ ছাড়া দেশের শহরবাসী যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না।
